টানা ১১ ম্যাচের জয়ের উচ্ছ্বাস নিয়ে প্যারিসে পা রেখেছিল বার্সেলোনা। কিন্তু পার্ক দে প্রিন্সেসে এসে থেমে গেল হ্যান্সি ফ্লিকের দলের দুরন্ত ছুটে চলা। গোল, পাল্টা আক্রমণ আর রক্ষণভুলে ভরা এক উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে কাতালানদের ৪-২ গোলে হারিয়ে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে ইউরোপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন পিএসজি।

শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে স্বাগতিকরা। বার্সেলোনার রক্ষণে কয়েক দফা ফাঁক তৈরি করে সুযোগও পেয়ে যায় পিএসজি। খিচা কাভারাস্কেইয়ার একটি শট গোলরক্ষক হোয়ান গার্সিয়ার গ্লাভস ছুঁয়ে পোস্টে আঘাত না করলে ম্যাচের শুরুতেই এগিয়ে যেতে পারত প্যারিসের দলটি।

তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে বার্সেলোনাও নিজেদের ছন্দ ফিরে পায়। পেদ্রি, দানি ওলমো ও লামিন ইয়ামালের সমন্বয়ে আক্রমণে ধার বাড়াতে থাকে তারা। কিন্তু দুই দলকেই প্রথমার্ধে বড় ধাক্কা দেয় চোট। পিএসজির উসমান দেম্বেলে এবং বার্সেলোনার দানি ওলমো হ্যামস্ট্রিংয়ের সমস্যায় মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন।

৩৮ মিনিটে অবশ্য গোলের দেখা পায় পিএসজি। বার্সেলোনার আক্রমণ থেকে বল কেড়ে নিয়ে লামিন ইয়ামালের একটি পাস মাঝপথে আটকে দেন দেজিরে দুয়ে। এরপর বক্সের বাইরে থেকেই নিচু শটে গার্সিয়াকে পরাস্ত করেন তিনি। ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় পিএসজি।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও স্বাগতিকদের আক্রমণ থামেনি। আশরাফ হাকিমির শক্তিশালী শট দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে বার্সেলোনাকে ম্যাচে রাখেন গার্সিয়া। এরপর ধীরে ধীরে ম্যাচের চিত্র বদলে দিতে শুরু করে কাতালানরা।

৫৫ মিনিটে ফেরমিন লোপেজের সঙ্গে চমৎকার বোঝাপড়ার পর গোল করেন জাভি এসপার্ত। পিএসজি গোলরক্ষক মাতভেই সাফোনভকে পরাস্ত করে করা এই গোলটি চ্যাম্পিয়নস লিগে তরুণ ফরোয়ার্ডের প্রথম গোল।

সমতায় ফেরার পর বার্সেলোনা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। তবে পিএসজিও ছাড়ার পাত্র ছিল না। চোটের কারণে মার্কিনিওস ও কাভারাস্কেইয়াকে হারিয়েও আক্রমণের ধার ধরে রাখে তারা। ৭২ মিনিটে কর্নার থেকে আসা বলের সুবিধা নিয়ে হেডে পিএসজিকে আবার এগিয়ে দেন লুকাস এরনান্দেস।

তবে ম্যাচ তখনও পুরোপুরি খোলা। ৭৯ মিনিটে ডান দিক থেকে দুর্দান্ত ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে আবারও বার্সেলোনাকে সমতায় ফেরান লামিন ইয়ামাল। প্রতিপক্ষের রক্ষণ কাটিয়ে বুটের বাইরের অংশ দিয়ে নেওয়া তার নিখুঁত শটে সাফোনভের কিছুই করার ছিল না।

২-২ হওয়ার পর বার্সেলোনার ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাই তখন বেশি মনে হচ্ছিল। কিন্তু সমতা ফেরানোর পর নিজেদের রক্ষণে যে জায়গা তারা ছেড়ে দিয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়ায়।

মাত্র দুই মিনিট পরেই পিএসজিকে ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেন ভিতিনিয়া। বক্সের কাছে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তার নেওয়া শক্তিশালী শট বার্সেলোনার জালে গিয়ে ঠেকে। গোল হজমের পর সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে আক্রমণে আরও বেশি খেলোয়াড় তুলে নেয় বার্সেলোনা। আর সেই সুযোগেই ম্যাচের শেষ আঘাতটি হানে পিএসজি।

ডান প্রান্ত দিয়ে আক্রমণে উঠে হাকিমির দেওয়া বল ফাঁকা জায়গায় পেয়ে সহজেই জালে পাঠান ফাবিয়ান রুইস। তাতে নিশ্চিত হয় পিএসজির ৪-২ ব্যবধানের জয়।

এই হার বার্সেলোনার জন্য শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়, বরং বড় এক সতর্কবার্তাও। ঘরোয়া লিগে টানা নয় জয় এবং চ্যাম্পিয়নস লিগে আগের দুই ম্যাচে সাফল্যের পর দুর্দান্ত ছন্দে থাকা দলটির সামনে এবার পরিষ্কার হয়ে গেল, ইউরোপের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিপক্ষের বিপক্ষে আক্রমণাত্মক ফুটবলের পাশাপাশি রক্ষণেও সমান সতর্ক থাকতে হবে।

ইয়ামাল ও এসপার্তের মতো তরুণদের প্রতিভা বার্সেলোনাকে আশাবাদী করলেও পিএসজি দেখিয়ে দিল—উচ্চ রক্ষণভাগ, দ্রুত আক্রমণে ওঠা এবং প্রতিপক্ষের ভুল কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে সামান্য অসতর্কতার মূল্যও বড় ম্যাচে ভয়াবহ হতে পারে। প্যারিসে সেই মূল্যই দিতে হলো টানা ১১ জয়ে উড়তে থাকা বার্সেলোনাকে।