খুলনায় থামছে না খুন, গুলিবর্ষণ ও সশস্ত্র হামলার ঘটনা। মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একের পর এক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সড়ক থেকে আবাসিক এলাকা, এমনকি হাসপাতাল-ক্লিনিকেও ছড়িয়ে পড়েছে সন্ত্রাসীদের তৎপরতা। চাঁদা দাবি করে হুমকি, সশস্ত্র মহড়া, ভাঙচুর ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। অন্যদিকে অপরাধীদের গ্রেপ্তার, জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়া এবং ভুক্তভোগীদের মামলা করতে অনীহার বিষয়টি তুলে ধরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জের কথা বলছে পুলিশ।
খুলনা মহানগর ও জেলা পুলিশের অপরাধ শাখার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে খুলনায় গুলি, কুপিয়ে ও অন্যান্যভাবে ৭১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬৯টি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের পেছনে অস্ত্র ও মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, পূর্বশত্রুতা এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরোধের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
সর্বশেষ গত সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নগরীর পৃথক তিনটি এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তিনজন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন যুবদল ও ছাত্রদলের সাবেক দুই নেতা এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী। এর আগে কয়েক দিনের ব্যবধানে দুটি হত্যাকাণ্ড এবং এক কলেজশিক্ষককে গুলি করার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং নগরীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
গত মঙ্গলবার গুলিবিদ্ধ হন বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি অহিদুল ইসলাম বাদল, আমিরপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সোহেল শেখ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সালমান হাওলাদার। পৃথক এসব ঘটনার মধ্যে সালমানের কাছ থেকে একটি ল্যাপটপের ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। প্রতিদিন কর্মস্থলের টাকা ওই ব্যাগে নিয়ে ব্যাংকে জমা দিতে যেতেন তিনি। এসব ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে গত ২২ অক্টোবর ভোরে নগরীর পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় তাওহিদুল ইসলাম তুষার (৩২) নামে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) শাহ আলম বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। মামলার এজাহারে শহিদুল ইসলাম সেজান, সাকিবুর রহমান জিতু ও রাব্বি চৌধুরীর সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই দিন সন্ধ্যার পর নগরীর জিন্নাহপাড়া এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় খুশি আক্তার (২৫) নামে এক গৃহবধূকে। এ ঘটনায় নিহতের বোন হাসি আক্তার বাদী হয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত আশিক, মিরাজ খানসহ চারজনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা করেন। তবে এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সময় পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
গত শনিবার রাতে নগরীর টুটপাড়া গাছতলা মন্দিরের সামনে রূপসা কলেজের প্রভাষক আকাশ কুণ্ডুকে (৪৫) গুলি করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায়ও শুরুতে কাউকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়নি।
খুলনা মহানগর পুলিশের সদর জোনের সহকারী কমিশনার শফিকুল ইসলাম চরচা বলেন, আধিপত্য বিস্তারের জেরে তুষার ও খুশি আক্তার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আর চাঁদা না দেওয়ায় আকাশ কুণ্ডুকে গুলি করা হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তুষার হত্যা মামলায় ইতিমধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
খুলনায় সন্ত্রাসী তৎপরতার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হয়ে উঠেছে চিকিৎসাসেবাকেন্দ্রে হামলা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ। গত শনিবার রাতে নগরীর সন্ধানী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে দুর্বৃত্তরা। আতঙ্ক ছড়াতে ক্লিনিকের বাইরে এক রাউন্ড ফাঁকা গুলিও ছোড়া হয়। এ ঘটনায় ক্লিনিকের এক কর্মকর্তা আহত হন। এ ছাড়া এক কর্মীর মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
কেন এই হামলা হয়েছে, তা জানেন না বলে জানিয়েছেন ক্লিনিকটির ব্যবস্থাপক মহিদুল ইসলাম রাজু। তিনি বলেন, ‘কেন হামলা হয়েছে, জানি না। কেউ চাঁদা চেয়েছিল বলেও শুনিনি।’
এর আগের দিন নগরীর প্রিন্স হাসপাতালে ঢুকে চাঁদা দাবি করে অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তরা হুমকি দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ২৫ অক্টোবর দুপুরে নগরীর মজিদ সরণিতে অবস্থিত সন্ধানী ক্লিনিকের আরেকটি শাখায় সশস্ত্র মহড়া দেয় কয়েকজন যুবক। হাসপাতালটির চিকিৎসক পার্থ সাহা জানান, দুপুরে আট থেকে ১০ জন যুবক ক্লিনিকে প্রবেশ করে ব্যবস্থাপককে খুঁজতে থাকে। তাদের হাতে অস্ত্র ছিল।
এ ছাড়া ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় নগরীর শেরেবাংলা সড়কে অবস্থিত সুরক্ষা ক্লিনিকে চাঁদা দাবি করে পারভেজ নামে এক যুবক ফোন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, আতঙ্কের কারণে তারা বিষয়টি পুলিশকে জানাননি।
হত্যাকাণ্ড, গুলিবর্ষণ ও চিকিৎসাসেবাকেন্দ্রে হামলার এসব ঘটনায় অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জোরালো হচ্ছে। তবে পুলিশ বলছে, অপরাধ দমনে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং গত ১০ মাসে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের একটি অংশকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
খুলনা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার রেজাউর রহমান বলেন, নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশ আন্তরিকভাবে কাজ করছে। প্রতিটি অপরাধের ঘটনায় পুলিশ সক্রিয় রয়েছে। গত ১০ মাসে ৬০ জন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১২ জন শীর্ষ সন্ত্রাসী রয়েছেন। ক্লিনিকে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ভুক্তভোগীদের সহযোগিতা না পাওয়াকে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁর ভাষ্য, চাঁদাবাজি কিংবা গুলির ঘটনায় অনেকে মামলা করতে চান না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসার প্রবণতা। এসব কারণে খুলনায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে এ পরিস্থিতিতেও পুলিশ দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি রাখছে না বলে দাবি করেন তিনি।
মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের দমনে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সুশীল সমাজ এবং সচেতন নাগরিকদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
এদিকে খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন চরচা। তিনি বলেন, অপরাধীদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ফোরামে কথা বলছেন।
তুহিন চরচা আরও বলেন, পুলিশ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করলেও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে তাঁরা জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সন্ত্রাস দমনে কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের সন্ত্রাস দমন কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সন্ত্রাস দমনে সেই ধরনের পদক্ষেপে ফিরে যাওয়া উচিত। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যৌথ বাহিনী মোতায়েনেরও দাবি জানান তিনি।
খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড, গুলিবর্ষণ, চাঁদাবাজি ও চিকিৎসাসেবাকেন্দ্রে হামলার অভিযোগ নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযান অব্যাহত রাখার কথা বলা হলেও অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো, চাঁদাবাজদের আইনের আওতায় আনা এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা বন্ধ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। নগরবাসীর প্রত্যাশা, অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে সাধারণ মানুষ ও চিকিৎসাসেবাকেন্দ্রগুলো নিরাপদে তাদের কার্যক্রম চালাতে পারে।

মন্তব্য করুন