ঢাকার পূর্বাচল থেকে ভোলার ইলিশা পর্যন্ত নৌপথে যাতায়াতের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে ‘কার্নিভাল ক্রুজ’। শিমুলিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া এই বিশেষ ফেরিতে সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টায় ভোলা পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। যাত্রীদের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ি ও পণ্যবাহী যানবাহন পারাপারের সুবিধা থাকায় এ নৌপথে আগ্রহ বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১৯ মার্চ থেকে শিমুলিয়ার টুরিস্ট ঘাট ও ভোলার ইলিশা ঘাটের মধ্যে এই ফেরি চলাচল শুরু হয়। পূর্বাচলের ৩০০ ফিট সড়কের কাছাকাছি ঘাট হওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে যাত্রীদের সেখানে পৌঁছানো তুলনামূলক সহজ। এতে সদরঘাটমুখী যাতায়াতের চাপও কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

শিমুলিয়া ঘাটে সরেজমিনে দেখা যায়, ফেরিতে ওঠার জন্য বিভিন্ন ধরনের যানবাহন অপেক্ষা করছে। পাশাপাশি যাত্রীরাও টিকিট সংগ্রহ করে নির্ধারিত সময়ে ফেরিতে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নির্ধারিত সময় হলে যাত্রী ও যানবাহন নিয়ে ভোলার ইলিশার উদ্দেশে ঘাট ছাড়ে ‘কার্নিভাল ক্রুজ’।

‘যাব বাড়ি, সাথে নিয়ে যাব গাড়ি’ স্লোগানকে সামনে রেখে পরিচালিত এই ফেরিতে একসঙ্গে প্রায় ২৫ থেকে ৪০টি প্রাইভেটকার অথবা ১২ থেকে ১৫টি বড় ট্রাক পরিবহন করা যায়। যাত্রীদের জন্য সাধারণ ডেকের পাশাপাশি চেয়ার সিট, এসি বিজনেস ক্লাস চেয়ার, ভিআইপি ও ফ্যামিলি কেবিনের ব্যবস্থাও রয়েছে।

কার্নিভাল ক্রুজ প্রতিদিন সকাল ৮টায় শিমুলিয়া ঘাট থেকে ভোলার ইলিশার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। সাধারণ ডেকে যাত্রীপ্রতি ভাড়া ৩০০ টাকা, এসি আসনে ৫০০ টাকা। ফ্যামিলি কেবিনের ভাড়া ২ হাজার টাকা এবং ভিআইপি কেবিনের ভাড়া ৩ হাজার ৫০০ টাকা। নদীপথ ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে বিকেল ৩টার দিকে ফেরিটি ইলিশা ঘাটে পৌঁছে। এরপর সন্ধ্যা ৭টায় আবার ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসে এবং ভোরের দিকে শিমুলিয়া ঘাটে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

শুক্র ও শনিবার ছুটির দিনে এ নৌপথে যাত্রীদের চাপ তুলনামূলক বেশি থাকে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। যাত্রীদের ঘাটে আসা-যাওয়ার সুবিধার জন্য এমকে শিপিং ট্রান্সপোর্টের পক্ষ থেকে শাটল বাসের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রতিদিন সকালে কুড়িল বিশ্বরোড থেকে যাত্রীদের শিমুলিয়া ঘাটে আনা হয়। আবার ভোলার ইলিশা থেকে ফেরি করে আসা যাত্রীদের শিমুলিয়া ঘাট থেকে কুড়িল বিশ্বরোডে পৌঁছে দেওয়া হয়।

যানবাহন পারাপারের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত ভাড়া রয়েছে। বিআইডব্লিউটিসি সূত্র অনুযায়ী, ১০ চাকার গাড়ির জন্য ২৫ হাজার টাকা, ৮ থেকে ১১ টন ওজনের বড় ট্রাকের জন্য ১৬ হাজার টাকা, ৫ থেকে ৮ টনের ট্রাকের জন্য ১৪ হাজার ৬০০ টাকা এবং ৩ থেকে ৫ টনের ট্রাকের জন্য ১২ হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। মাইক্রোবাসের ভাড়া ৯ হাজার টাকা, এক টন ওজনের মাইক্রোবাসের ৭ হাজার টাকা এবং মোটরসাইকেলের জন্য ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঘাটে অপেক্ষমাণ যাত্রী শামিম হোসেন বলেন, সড়কপথের দীর্ঘ যাত্রার তুলনায় নদীপথে চলাচলে ভিন্ন ধরনের স্বস্তি রয়েছে। বিশেষ করে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ফেরিতে গাড়ি পারাপারের সুবিধাটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

শামীমা বেগম নামে আরেক যাত্রী জানান, পেশাগত কারণে তারা গাজীপুরে থাকেন এবং নিয়মিত গ্রামের বাড়িতে যেতে হয়। পূর্বাচলের কাছে ফেরিঘাট চালু হওয়ায় সদরঘাটের যানজট এড়িয়ে যাতায়াত করা সহজ হয়েছে বলে জানান তিনি।

নিজের প্রাইভেটকার নিয়ে ভোলায় যাচ্ছিলেন ব্যবসায়ী আজিম সরকার। তিনি বলেন, সড়কপথের যানজট এড়িয়ে ফেরিতে গাড়ি নিয়ে যাওয়া তার জন্য সুবিধাজনক। তার দাবি, ফেরির ভাড়া দেওয়ার পরও সড়কপথে গাড়ি চালানোর তুলনায় জ্বালানি খরচ কম হচ্ছে।

কাভার্ডভ্যানে পণ্য নিয়ে ভোলার দিকে যাচ্ছিলেন ব্যবসায়ী শাহীন প্রামাণিক। তার মতে, যাত্রীদের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের যানবাহন ও পণ্য পরিবহনের সুযোগ থাকায় দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এ নৌপথ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

পণ্যবাহী ট্রাকচালক বুলবুল হোসেনও জানান, শিমুলিয়া থেকে ফেরি চালু হওয়ায় পণ্য পরিবহনে সুবিধা হয়েছে। সড়কপথে জ্বালানি ব্যয়ের তুলনায় ফেরিতে যানবাহন পারাপারে খরচ কম পড়ছে বলে জানান তিনি।

কার্নিভাল ক্রুজের চালক মহসিন ইসলাম বলেন, প্রতিদিন সকাল ৮টায় শিমুলিয়া ঘাট থেকে তারা যাত্রা শুরু করেন এবং সাধারণত বিকেল ৩টার মধ্যে ভোলায় পৌঁছান। তবে নদীর স্রোত ও অন্যান্য নৌপরিস্থিতির কারণে কখনো কখনো সময় কিছুটা কমবেশি হতে পারে।

এমকে শিপিং ট্রান্সপোর্টের জিএম মীর আনোয়ার হোসেন বলেন, কার্নিভাল ক্রুজে যাত্রীরা নিয়মিত যাতায়াত করছেন। ঘাটে যাত্রীদের যাতায়াত সহজ করতে কুড়িল বিশ্বরোড থেকে বিনামূল্যে শাটল বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। তবে বর্তমানে যাত্রীসংখ্যা এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছেনি বলে জানান তিনি।

বিআইডব্লিউটিসি নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী স্বদেশ প্রসাদ মণ্ডল জানান, নারায়ণগঞ্জের শিমুলিয়া ও কাচপুর ঘাট থেকে ভোলার ইলিশা ঘাটে যাত্রী ও যানবাহন নিয়ে নিয়মিত ফেরি চলাচল করছে। যাত্রীরা নিরাপদে যাতায়াত করছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য বিআইডব্লিউটিসির বাণিজ্যিক বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি।

এই নৌপথ চালুর ফলে পূর্বাচল ও আশপাশের এলাকা থেকে ভোলাসহ দক্ষিণাঞ্চলে যাত্রী ও যানবাহন পরিবহনের একটি বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। এখন সেবাটির যাত্রীসংখ্যা, সময়ানুবর্তিতা ও পরিচালন সক্ষমতা কতটা স্থায়ী হয়, সেটিই দেখার বিষয়।