ক্রসফায়ার নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের বক্তব্যকে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের যথাযথ প্রয়োগ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর সময়োপযোগী আহ্বান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএসএ)।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীনের সই করা এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের পরিবর্তিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মব কালচার এবং ৫ আগস্ট-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের আইন প্রয়োগে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

সম্প্রতি পুরান ঢাকার চকবাজারে একটি কমিউনিটি ব্যাংকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইজিপির দেওয়া বক্তব্য প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের আলোকে বিবেচনার আহ্বান জানায় বিপিএসএ। সংগঠনটির ভাষ্য, বক্তব্যটির মূল তাৎপর্য হলো আইনের সীমার মধ্যে থেকে পরিস্থিতি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া এবং পুলিশ সদস্যদের পেশাগত আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিশ্চিত করা।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুসরণ করেই বাংলাদেশ পুলিশ তার কার্যক্রম পরিচালনা করে। দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি, পুলিশ আইন এবং পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গলসহ বিভিন্ন আইনে পুলিশের ক্ষমতা ও দায়িত্ব নির্ধারিত রয়েছে। এসব বিধান প্রয়োগের পাশাপাশি মানবাধিকার, সাংবিধানিক অধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেছে সংগঠনটি।

বিপিএসএ বলেছে, পুলিশের আইনানুগ কঠোরতাকে নেতিবাচকভাবে দেখা এবং অপরাধ দমনে নিষ্ক্রিয়তাকে দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যদের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় চারজন পুলিশ সদস্য নিহত এবং ৩৭০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। এ পরিস্থিতিতে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা ও দায়িত্ব পালনের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগে পুলিশ অযথা দ্বিধাগ্রস্ত হলে অপরাধীরা উৎসাহিত হতে পারে। তবে আইনের সীমা অতিক্রম না করে দৃঢ়তা, নিরপেক্ষতা, পেশাদারত্ব ও মানবিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনই পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ানোর ভিত্তি।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আপত্তি

এদিকে আইজিপির বক্তব্যকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে বিপজ্জনক বার্তা হিসেবে দেখছে কয়েকটি মানবাধিকার ও নাগরিক সংগঠন। তারা বক্তব্য প্রত্যাহার, সরকারের ব্যাখ্যা এবং আইজিপির জবাবদিহি দাবি করেছে। কয়েকটি রাজনৈতিক দলও বক্তব্যটির নিন্দা জানিয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আইজিপির বক্তব্যকে ‘অপরিণামদর্শী’ বলে আখ্যায়িত করেছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন তুলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতার ঢাল হিসেবে পুলিশপ্রধান ক্রসফায়ারকে ব্যবহার করতে চাইছেন কি না।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলেছে, কোনো নাগরিক অপরাধে অভিযুক্ত হলেও আদালতের বাইরে তাঁকে হত্যার অধিকার রাষ্ট্রের নেই। আইজিপির বক্তব্য পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না—সরকারের পক্ষ থেকে এমন স্পষ্ট ঘোষণা চেয়েছে সংগঠনটি।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটিও (এইচআরএসএস) প্রশ্ন তুলেছে, সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে অনুমোদনযোগ্য মনে করে কি না। সংগঠনটির বক্তব্য, অপরাধ দমনে রাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগের বৈধতা নির্ভর করে আইনের প্রতি আনুগত্যের ওপর, বিচারবহির্ভূত পদ্ধতির ওপর নয়।

অন্যদিকে, সাংবাদিকদের নিয়ে আইজিপির দেওয়া বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব)। সংগঠনটি সাংবাদিকদের পেশাগত সততা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে তাঁর ঢালাও মন্তব্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। ক্র্যাব সভাপতি মির্জা মেহেদী তমাল ও সাধারণ সম্পাদক এম এম বাদশাহ্ যৌথ বিবৃতিতে এ দাবি জানান।