ঋণ জালিয়াতি, চুক্তি লঙ্ঘন, জামানত ছাড়া অর্থ ছাড় এবং বিপুল পরিমাণ বকেয়া আদায়ে ব্যর্থতার নানা চাঞ্চল্যকর অভিযোগে সরকারি সংস্থা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) সার্বিক ব্যবস্থাপনা এখন চরম প্রশ্নের মুখে। সংস্থাটির পুরনো কর্মসূচিগুলোতে বড় ধরনের শ্রেণিবদ্ধ ঋণ থাকা সত্ত্বেও তাদের হাতে সরকারের নতুন রুফটপ সোলার (ডিআরএস) কর্মসূচির ৫০০ কোটি টাকা তুলে দেওয়ায় এই সোলার প্রকল্পের সাফল্য নিয়েও তীব্র সংশয় প্রকাশ করছেন খাতের উদ্যোক্তারা।
ইডকলের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, সোলার হোম সিস্টেম (এসএইচএস) কর্মসূচিতে ৪৪টি সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া ৪ হাজার ২৪২ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বকেয়া ছিল ১ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা। এরপর ঋণ আদায়ে সুদের হার শূন্যে নামিয়ে এনে প্রায় ৪৮৯ কোটি টাকা মওকুফ করা সত্ত্বেও বাকি বকেয়া ঋণের পুরোটাই এখন খেলাপি। পাশাপাশি সোলার ইরিগেশন পাম্প কর্মসূচির ৬৭ শতাংশ এবং বায়োগ্যাস প্রকল্পের ৭৯ শতাংশ ঋণই শ্রেণিবদ্ধ বা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
সংস্থাটির চরম অনিয়মের বড় প্রমাণ মিলেছে ২০০৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত হিলফুল ফুজুল সমাজকল্যাণ সংস্থাকে ছাড় করা ৯৭টি কিস্তির ১৩৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকার ঋণে, যা সুদে-আসলে ১৪৯ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট চুক্তির অনুমোদিত ঋণসীমা তোয়াক্কা না করে কয়েকগুণ বেশি অর্থ ছাড় দেওয়া হয়েছিল। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে জামানত ছাড়াই জালিয়াতির মাধ্যমে এসব অর্থ ছাড়ের সুস্পষ্ট তথ্য উঠে আসে।
নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সোলার সিস্টেমের অন্তত ১০ শতাংশ সরেজমিনে পরিদর্শনের কথা থাকলেও সংস্থাটি মাত্র ৫ শতাংশ পরিদর্শন করেছে। এছাড়া বোর্ড সভার তোয়াক্কা না করে সংশোধিত চুক্তি থেকে জমি ও পরিচালকদের বন্ধকী জামানত বাদ দেওয়ার প্রমাণ মেলে। অর্থ ছাড়ের প্রত্যয়নপত্র দেওয়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের প্রধান এনামুল করিম পাভেল অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, খেলাপি অর্থ আদায়ে আইনি দল কাজ করছে।
শুধু ঋণ জালিয়াতিই নয়, ঠিকাদারি কাজ বণ্টনেও বড় ধরনের স্বজনপ্রীতির তথ্য মিলেছে। ২০১৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৩০১ মেগাওয়াট সক্ষমতার ৭৭টি রুফটপ সোলার প্রকল্পের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ কাজ দেওয়া হয়েছে একক একটি প্রতিষ্ঠান স্কিউব টেকনোলজিসকে। অভিযোগ রয়েছে, এই নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ না দিলে ইডকল থেকে ঋণ অনুমোদনে জটিলতা সৃষ্টি করা হতো। এমনকি দ্বৈত অর্থায়ন এবং একই সিস্টেমের সিরিয়াল নম্বর বদলে বারবার অর্থ নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
এই পরিস্থিতিতে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ জানান, ইডকলের মতো অর্থায়নকারী সংস্থাকে নীতিনির্ধারক কিংবা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব দেওয়া ঠিক হয়নি। সামগ্রিক বিষয়টি পর্যালোচনা করে ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী জানান, ইডকলের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও সমস্ত অনিয়মের অভিযোগ গভীর তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং নতুন প্রকল্পে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।




মন্তব্য করুন