ভাষা এবং পেশাগত দক্ষতা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীদের সম্পূর্ণ বিনা খরচে ইতালি যাওয়ার একটি বিশেষ সুযোগ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। তিনি জানান, খুব শিগগিরই অত্যন্ত স্বল্পপরিসরে এই প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে।
মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে ‘ইতালিতে দক্ষ অভিবাসনের জন্য ভাষা, নাগরিক ও পেশাগত প্রশিক্ষণ’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র এসব কথা জানান।
ইতালিয়ান দূতাবাস এবং তাদের আন্তর্জাতিক সহযোগী অংশীদারদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারে মাহ্দী আমিন বলেন, ইতালিয়ান ভাষা শিক্ষা, সুনির্দিষ্ট কর্মদক্ষতা অর্জন এবং পেশাগত সঠিক আচরণ ও মূল্যবোধ বিকাশে এই কার্যকর মডেলটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমান নির্বাচিত সরকার এই পূর্ণাঙ্গ কাঠামোটিকে জাতীয় পর্যায়ে বৃহত্তর পরিসরে ছড়িয়ে দিতে এবং দেশের বিভিন্ন স্তরে অত্যন্ত কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে চায় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দক্ষ অভিবাসন নিশ্চিতকরণ প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, দক্ষ, নিয়মতান্ত্রিক ও কম খরচে বৈদেশিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা বর্তমান নতুন বাংলাদেশ সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট ও প্রধান রূপকল্পের অন্তর্ভুক্ত। আয়োজকদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার সাথে এই আয়োজনটি শতভাগ সঙ্গতিপূর্ণ। দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের ওপরও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মাহ্দী আমিন আরও জানান, অভিবাসন প্রত্যাশী কর্মীদের জন্য একটি সুশৃঙ্খল, নিয়মতান্ত্রিক ও সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিদেশে কাজের পথ উন্মোচন করা অত্যন্ত জরুরি। যেখানে অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে এবং সম্ভব হলে তা সম্পূর্ণ শূন্য খরচে নিশ্চিত করা হবে। এই যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের দক্ষ জনগোষ্ঠীর অভিবাসন প্রক্রিয়া আরও বেশি বেগবান হবে বলে তিনি গভীর আশা প্রকাশ করেন।
দক্ষ অভিবাসন নিশ্চিতকরণে আন্তর্জাতিক সহযোগীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন খাতে এটি বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন মাহ্দী আমিন। তিনি জানান, এই সফল উদ্যোগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় ইতালির এই সফল মডেলটিকে ভিন্ন ভিন্ন খাতে, অন্যান্য দেশে এবং নতুন ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রেও সহজে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব।
সেমিনারে উপস্থিত প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একমাত্র জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘বোয়েসেল’-এর প্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, জাতীয় নীতির সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখে সবাইকে এক দল হয়ে অভিন্ন লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। ইতালি সরকারের এই ইতিবাচক উদ্যোগটি যাতে জাতীয় নীতিতে সঠিকভাবে একীভূত হয়, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সকল নীতি সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান তিনি। একই সাথে সংসদ সদস্য ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এক হয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
বর্তমানে ইতালিতে বসবাসরত আড়াই লাখেরও বেশি বাংলাদেশির অসামান্য অবদানের কথা সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করে মাহ্দী আমিন বলেন, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও চিকিৎসার পাশাপাশি জনমানুষের পারস্পরিক সেতুবন্ধনে অভিবাসন সবসময়ই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। ইতালির সমাজ ও মূলধারার অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের ভূমিকা যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি তাদের প্রেরিত রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রবাসী ভাইবোনদের প্রতিটি অর্জনের পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ ও সফলতার অদম্য গল্প।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর মেধা ও যোগ্যতার বিন্দুমাত্র ঘাটতি নেই উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, মূল চ্যালেঞ্জ হলো সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান, তাদের যথাযথ দক্ষ করে গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। প্রবাসীদের কল্যাণে সরকার ইতোমধ্যে নানামুখী যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের আদলে প্রবাসী ভাইবোনদের সার্বিক সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খুব শীঘ্রই ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তরুণদের তৃতীয় ভাষা শিক্ষায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানান মাহ্দী আমিন। আজকের এই অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা যে ইতালিয়ান ভাষা, আধুনিক কাজের দক্ষতা এবং পেশাগত নিয়মকানুন শিখছেন, তা সরকারের তৃতীয় ভাষা শিক্ষা কার্যক্রমেরই বাস্তব প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেন তিনি। ভবিষ্যতে এই সফল আয়োজনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ইতালিয়ান ভাষাসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষাকে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষা কারিকুলামে নিয়মিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
অনুষ্ঠানে প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশ্যে মাহ্দী আমিন বলেন, আপনারা কেবল নিজেদের উজ্জ্বল ক্যারিয়ারই গড়ছেন না, বরং বিশ্বমঞ্চে দক্ষ ও মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে কাজ করার ক্ষেত্রে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যাচ্ছেন। আগামী দিনে ধাপে ধাপে ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করার মাধ্যমে আপনাদের সামনে অমিত সম্ভাবনার এক নতুন দুয়ার উন্মুক্ত হবে।
সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকায় নিযুক্ত ইতালির বর্তমান রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মিশন প্রধান ড. লরা টম বন্ডে, ঢাকায় নিযুক্ত ইতালির উপ-মিশন প্রধান ডা. ফেদেরিকো জামপারেল্লি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের উপ-প্রধান বাইবা জারিনা এবং ইতালিয়ান দূতাবাসের অভিবাসন উপদেষ্টা জুসেপ্পে দি জিওভান্নি প্রমুখ।




মন্তব্য করুন