ভিটেমাটির এক ইঞ্চি জমিও নেই, অন্যের জমিতে ভাঙা চালাঘরে মাথা গুঁজে বাস। সংসারের অভাব মোচন ও পড়াশোনার খরচ জোগাতে দিনমজুরি, হোটেল বয় থেকে শুরু করে করেছেন টিউশনিও। কিন্তু হাজারো প্রতিকূলতা ও দারিদ্র্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক মুহূর্তের জন্যেও লক্ষ্যচ্যুত হননি তিনি। সব বাধা পেরিয়ে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় সব বিষয়ে এ প্লাসসহ জিপিএ-৫ অর্জন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন বিশাল সরকার কৌশিক। কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষার্থীর এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে নিদারুণ কষ্ট আর এক অসম্ভব সংগ্রামের গল্প।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী বাজারের পাশে অন্যের জমিতে গড়ে ওঠা একটি জীর্ণ কুটিরে বসবাস এই মেধাবী তরুণের পরিবারের। ছোটখাটো তিনটি ভাঙাচোরা চালাঘরে দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট, যেখানে পুরোনো টিনের চালে রয়েছে অসংখ্য ফুটো আর বাঁশঝাড়ের এক কোণায় খোলা রান্নাঘর। কৌশিকের মা কণা রানী একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলের আয়া হিসেবে সামান্য সম্মানী পান। অন্যদিকে বাবা সুকুমার সরকার অসুস্থতা সত্ত্বেও পেটের দায়ে সপ্তাহে দুদিন হাটবারে খোলা জায়গায় একটি ছোট টি-স্টল চালান। এই সামান্য আয়ে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা তাদের সংসারে।

পরিবারের অভাবের এই যন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে ঋণের বিশাল বোঝা। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নেন মা কণা রানী। কিস্তি শোধ করার মতো পর্যাপ্ত আয় না থাকায় বেসরকারি সংস্থা আশা থেকে আরও ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিতে হয় তাকে। সপ্তাহে ২ হাজার ৩০০ টাকার কিস্তির চাপ সইতে না পেরে পরবর্তীতে আরও ৫০ হাজার টাকা ধার করতে হয়। এভাবেই ঋণের জালে জড়িয়ে প্রতিনিয়ত ধুঁকছে এই সহায়-সম্বলহীন পরিবারটি।

কাঁঠালবাড়ী বিদ্যাকানন থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পাওয়ার পর বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি থেকে ১০ কিলোমিটার দূরের কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন কৌশিক। সেখান থেকেও এসএসসিতে সব বিষয়ে এ প্লাসসহ জিপিএ-৫ অর্জন করেন তিনি। এরপর ভর্তি হন কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে। কৌশিকের এই সফলতার পথটি কখনোই সহজ ছিল না। স্কুলে ভর্তির পর এক বন্ধুর দেওয়া পুরোনো প্যান্ট আর জুতা পরেই শুরু হয়েছিল তার স্কুলজীবন। নবম শ্রেণি পর্যন্ত অর্থাভাবে কোনো প্রাইভেট টিউশনি পড়ার সৌভাগ্য হয়নি তার। পরবর্তীতে কয়েকজন মানবিক শিক্ষক তাকে বিনা মূল্যে পড়ান। এসএসসিতেও এক প্রবাসী ব্যক্তির আর্থিক সহায়তা ও শিক্ষকদের আন্তরিকতায় তার স্বপ্ন পূরণের যাত্রা অব্যাহত ছিল।

কৌশিক তার সংগ্রামের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে জানান, অনেক দিন অটোরিকশার ভাড়াও ছিল না তার কাছে, ফলে পায়ে হেঁটে বা না গিয়ে দিন কাটাতে হয়েছে। সারাদিন অভুক্ত থেকে পড়ার টেবিলে বসেছেন। চিকিৎসক হওয়ার তীব্র স্বপ্ন থেকেই তিনি বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু পড়াশোনার খরচ যখন বাবা দিতে পারছিলেন না, তখন শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তাকে বিনা মূল্যে টিউশনি পড়িয়েছেন এবং নানাভাবে সহায়তা করেছেন। এমনকি নিজের খরচ মেটাতে তিনি হোটেল বয়ের কাজ করতেও পিছপা হননি।

কৌশিকের বাবা সুকুমার সরকার জানান, তার তিন ছেলেমেয়েই অত্যন্ত মেধাবী। একসময় সড়কের ধারে সরকারি খাসজমিতে তার একটি ছোট টি-স্টল ছিল। কিন্তু ২০২০ সালে উচ্ছেদের সময় ঘরবাড়ির সঙ্গে দোকানটিও ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর থেকে এক প্রতিবেশীর সুপারি বাগান ও বাঁশঝাড়ের পাশে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। তার বড় ছেলে কর্ণ সরকার কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে অনার্সে পড়ছেন। আর একমাত্র মেয়ে সূচনাকে এসএসসি পাস করার পরই বাধ্য হয়ে বিয়ে দিতে হয়েছে। চরম অভাব-অনটনের মধ্যেও ছোট ভাইয়ের এই সেরা ফলাফলে আনন্দের বদলে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন বড় ভাই কর্ণ। এই অভাবের সংসারে ছোট ভাইয়ের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন কীভাবে পূরণ হবে, তা নিয়ে এখন গোটা পরিবার চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে।

মা কণা রানী আকুল কণ্ঠে জানান, তাদের দুজনের সামান্য আয়ে সংসারের জোগানই হয় না, তার ওপর চেপে বসেছে পাহাড়সমান ঋণের বোঝা। এমতাবস্থায় ছেলের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণের জন্য পড়াশোনার খরচ জোগানোর কোনো পথই তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। ছেলের এই স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে সরকার এবং সমাজের হৃদয়বান ও বিত্তবান ব্যক্তিদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার বিনীত আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। চরম অভাব আর প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে কৌশিকের এই অসাধারণ সাফল্য কেবল তার নিজের পরিবারেই নয়, পুরো অঞ্চলের মানুষের মনে নতুন আশার আলো জ্বেলে দিয়েছে।