ঢাকা: দেড় দশকের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন শাসন শেষে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি এই দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী।
ক্ষমতা গ্রহণের পর এক জনসভায় তারেক রহমান তার পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি স্পষ্ট করে বলেন, “নট দিল্লি, নট পিণ্ডি—বাংলাদেশ সবার আগে।” বিশ্লেষকরা তার এই অবস্থানকে ভারতের ওপর একক নির্ভরশীলতা কাটিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ১৮ মাস পর এই নির্বাচনকে নজিরবিহীন গণ-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
নয়াদিল্লির জন্য বর্তমান পরিস্থিতিকে এক কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশত্যাগী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থান করছেন। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও ভারত তাকে প্রত্যর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এই ইস্যুটি দুই দেশের বিদ্যমান শীতল সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।
হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে ভারতের সঙ্গে সাতটি দ্বিপাক্ষিক সফর ও নজিরবিহীন নিরাপত্তা সহযোগিতার বিপরীতে তিস্তা পানি বণ্টন ও সীমান্ত হত্যার মতো মৌলিক সমস্যাগুলো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। জনমনে তৈরি হওয়া এই ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটেছে এবারের নির্বাচনে। অন্যদিকে, গত ১৮ মাসে ইসলামাবাদের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কে বড় ধরনের বরফ গলার আভাস পাওয়া গেছে। করাচির সঙ্গে সরাসরি আকাশপথ চালু এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় আঞ্চলিক মেরুকরণে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
দিল্লিভিত্তিক থিংক ট্যাংক আইডিএসএ-র বিশ্লেষক স্মৃতি পট্টনায়েক মনে করেন, গত দেড় দশকে ঢাকা অতিরিক্ত মাত্রায় দিল্লির দিকে ঝুঁকে ছিল। এখন সেই ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ তারেক রহমানের সামনে। তবে দিল্লি ও ইসলামাবাদ—উভয় পক্ষ থেকেই ইতোমধ্যে অভিনন্দন বার্তা পেয়েছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী।
পর্যবেক্ষকদের মতে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আর কোনো নির্দিষ্ট শক্তির ‘পেছনের উঠান’ হিসেবে পরিচিত হতে চায় না। চীনের সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর মাধ্যমে ঢাকা নিজের কণ্ঠস্বর বিশ্বদরবারে আরও জোরালো করার পথে হাঁটছে। একক নির্ভরতা এড়িয়ে বিকল্প সম্প্রসারণই হবে নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

মন্তব্য করুন