ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি জাতীয় বিমান সংস্থা সৌদিয়ার একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে আগুন ধরে ধ্বংস হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিমানবন্দর থেকে ধারণ করা ভিডিওতে উড়োজাহাজটিতে আগুন জ্বলতে এবং অগ্নিনির্বাপক কর্মীদের তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে দেখা যায়। এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, তাঁদের বাহিনী দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে নাজরান বিমানবন্দর ও খামিস মুশাইত বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে হুথিদের এসব দাবি অস্বীকার করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। জোটের মুখপাত্র কর্নেল তুর্কি আল-মালিকির ভাষ্য, সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রিয়াদকে লক্ষ্য করে ছোড়া দুটি এবং খামিস মুশাইতকে লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করে ধ্বংস করেছে।
হামলার পর রিয়াদগামী এবং রিয়াদ থেকে ছেড়ে যাওয়া সব ফ্লাইট আগামী শনিবার পর্যন্ত বাতিল করেছে এয়ার ইন্ডিয়া। একই সঙ্গে সৌদি রাজধানীতে তাদের সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে লুফথানসা গ্রুপ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের মধ্যে ২০২২ সালে কার্যকর হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর গত জুলাইয়ে ইয়েমেনে নতুন করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এর পর থেকে লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চল ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব এবং হুথিদের মধ্যে সংঘাত আবারও তীব্র হয়েছে।
রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলার পর সতর্কতা জারি করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ৮ অক্টোবর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলার বিষয়ে মার্কিন মিশন অবগত রয়েছে এবং সৌদি আরবে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। বিমানবন্দরটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সৌদি আরবে কর্মরত মার্কিন সরকারি কর্মকর্তাদের এখন থেকে বিশেষ অনুমতি নিতে হবে বলেও জানানো হয়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে সৌদি আরবের একাধিক বিমানবন্দরে হামলার পর বৃহস্পতিবারের এ ঘটনা ঘটল। দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ও বুধবার আভা এবং কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এতে তিনজন নিহত হন—আভায় দুজন এবং রিয়াদে একজন বিদেশি নাগরিক। আহত হন অন্তত ৩৬ জন, যাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
এদিকে ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম প্রদেশ তাইজে স্থলযুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করেছে। সরকার সমর্থিত বাহিনী অগ্রসর হয়ে এডেন, লাহেজ ও তাইজের মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ আল-কাদাহা ও আল-ওয়াজিয়াহ সড়ক বিচ্ছিন্ন করার কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর জবাবে হুথিরা নতুন সরবরাহপথ চালু রাখতে আল-শামায়াতায়েন, আল-মা’ফের এবং দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের গ্রামগুলোতে অভিযান জোরদার করেছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সমর্থনপুষ্ট সরকারি বাহিনী বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে নজর রাখা আল-ওয়াজিয়াহ ও কাহবুব পর্বতমালার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। হুথি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো দ্রুত পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করেছেন ইয়েমেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এদিকে সামরিক কমান্ডাররা আগামী ৪৮ ঘণ্টায় সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছেন।
ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় ফ্রন্টে হুথিরা ধুবাবের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। এলাকাটি এডেন-তাইজের প্রধান সড়কের নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা এ সড়ক ব্যবহার করেন।
পৃথক এক বিবৃতিতে হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, পূর্বাঞ্চলীয় আল-জাওফ প্রদেশে হুথি অবস্থানের দিকে সৌদি বাহিনীর অগ্রযাত্রা তাঁদের বাহিনী প্রতিহত করেছে। তাঁর দাবি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে সৌদি সেনাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে, এতে কয়েক ডজন সেনা হতাহত হয়েছেন এবং সৌদি বাহিনী কোনো অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।
সারি আরও দাবি করেন, সাম্প্রতিক সংঘাত বৃদ্ধির পর থেকে সৌদি ও জোট বাহিনী মোট ১ হাজার ৬৪২টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় উভয় পক্ষের এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের মানবিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি) জানিয়েছে, গত জুলাই থেকে ইয়েমেনে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ পেতে তাদের কাছে পরিবারের পক্ষ থেকে ১ হাজার ৮০০টি অনুরোধ এসেছে।
ইয়েমেনে আইসিআরসির প্রতিনিধিদলের প্রধান ক্রিস্টিন চিপোলা বলেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের ভাগ্য ও অবস্থান জানার অধিকার তাঁদের পরিবারের রয়েছে। প্রতিটি নিখোঁজ মানুষের পেছনে একটি পরিবার চরম যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তাঁদের কষ্ট উপেক্ষা করা যায় না এবং অপেক্ষার সময় আর দীর্ঘায়িত করা উচিত নয়।
সূত্র: টেলিগ্রাফ ইউকে

মন্তব্য করুন