কন্যা শিশুর হাসি-ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি: “আমি কন্যা শিশু, স্বপ্ন গড়ি, সাহসে লড়ি, দেশের কল্যাণে কাজ করি”-এই প্রাণবন্ত প্রতিপাদ্য শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি।
জাতীয় কন্যা শিশু দিবস আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও সংস্কৃতিকে মনে করিয়ে দেয়-প্রতিটি কন্যা শিশুর মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি জাতির সম্ভাবনা।
কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বিকশিত করার জন্য প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা, প্রশাসনিক অঙ্গীকার এবং সামাজিক সহযোগিতা।

এই দিক থেকে শরীয়তপুর জেলাকে বলা যায় “রোল মডেল জেলা”- কারণ এখানকার জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম নারী নেতৃত্ব, মানবিক প্রশাসন ও সামাজিক উন্নয়নের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
জাতীয় কন্যা শিশু দিবস উপলক্ষে তার নেতৃত্বে যে সব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তা ভবিষ্যতের প্রজন্ম গঠনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

১. ইতিহাস ও তাৎপর্য: কন্যা শিশু দিবসের পেছনের অনুপ্রেরণা: বাংলাদেশে কন্যা শিশুর অধিকার রক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ চলছে। ১৯৯৮ সালে সরকারিভাবে প্রথমবার “জাতীয় কন্যা শিশু দিবস” ঘোষণা করা হয়, নারীর ক্ষমতায়ন ও বাল্যবিবাহ রোধে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে।
এর মূল উদ্দেশ্য ছিল—
🔹 কন্যা শিশুর শিক্ষা,
🔹 পুষ্টি ও স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করা,
🔹 বাল্যবিবাহ, নির্যাতন ও বৈষম্য প্রতিরোধ করা,
🔹 এবং সমাজে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করা।

দিবসটি কেবল নারীর নয়- এটি একটি মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক। প্রতিবার এই দিনে দেশের প্রতিটি জেলায় আলোচনাসভা, র‌্যালি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম হয়। কিন্তু সব জেলায় যে সমান গুরুত্ব বা প্রাণ থাকে তা নয়। শরীয়তপুরে এবারের আয়োজন ছিল ব্যতিক্রম- কারণ সেখানে নেতৃত্বে ছিলেন একজন নারী প্রশাসক, যিনি শুধু দায়িত্ব নয়, মন দিয়ে কাজ করেছেন।

২. তাহসিনা বেগম: এক মানবিক নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি:
জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম কেবল একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন- তিনি এক অনুপ্রেরণা।
তার নেতৃত্বের মূল দর্শন হলো, “উন্নয়ন মানে মানুষের মুখে হাসি।” তিনি বিশ্বাস করেন, নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া কোনো সমাজ টেকসই হতে পারে না।
শরীয়তপুরে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ডিজিটাল প্রশিক্ষণ এবং মানবিক সহায়তা কর্মসূচিতে যে আন্তরিকতা দেখিয়েছেন, তা প্রশাসনকে দিয়েছে নতুন প্রাণ।

কন্যা শিশু দিবসের অনুষ্ঠানে তার বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে এক দৃঢ় অঙ্গীকার- “একটি কন্যা শিশুর নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা।”

এই কথাটি কেবল বক্তৃতা নয়, বরং তার কর্মপদ্ধতির মেরুদণ্ড। তিনি নিজেই মাঠে যান, বিদ্যালয়ে কন্যা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন, অভিভাবকদের বোঝান শিক্ষা ও আত্মনির্ভরশীলতা কিভাবে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

৩. শরীয়তপুরে কন্যা শিশুর বাস্তব চিত্র: একটু বাস্তব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শরীয়তপুর একটি নদীবিধৌত জেলা, যেখানে শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে দীর্ঘদিন বৈষম্য ছিল। অবহেলিত গ্রামীণ অঞ্চলে কন্যা শিশুদের বিদ্যালয় ত্যাগের হার ছিল তুলনামূলক বেশি। তবে গত কয়েক বছরে এই চিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে।

তাহসিনা বেগমের নেতৃত্বে প্রশাসনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ কন্যা শিশুদের জীবনে পরিবর্তন এনেছে- স্কুল রিটার্ন ক্যাম্পেইন: যেসব মেয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিল, তাদের পুনরায় বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনা।
২️⃣ সেফ স্কুল প্রজেক্ট: বিদ্যালয়ের আশপাশে হয়রানি প্রতিরোধে সচেতনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৩️⃣ ডিজিটাল স্কিল ট্রেনিং: গ্রামীণ কন্যা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ ও অনলাইন ক্লাস চালু করা।
ফলাফল হিসেবে শরীয়তপুরে মাধ্যমিক পর্যায়ে কন্যা শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বেড়েছে প্রায় ১২% এবং বাল্যবিবাহের হার কমেছে দৃশ্যমানভাবে।

৪. সমাজে মনোভাবের পরিবর্তন: প্রশাসন ও জনগণের ঐক্য: কন্যা শিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা কেবল আইনি বা প্রশাসনিক বিষয় নয়— এটি সমাজের মানসিকতার বিষয়। একসময় যেখানে মেয়েদের পড়াশোনার বদলে গৃহস্থালির কাজে যুক্ত করা হতো, এখন সেখানে পরিবর্তন এসেছে।

এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে প্রশাসনের ধারাবাহিক জনসম্পৃক্ত উদ্যোগ—
🔹 ইউনিয়ন পর্যায়ে অভিভাবক সমাবেশ,
🔹 ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ সভা,
🔹 এবং স্কুল-কলেজে “কন্যা শিশু ক্লাব” গঠন।

জেলা প্রশাসনের নারী কর্মকর্তারা মেয়েদের সামনে রোল মডেল হয়ে উঠেছেন। তাহসিনা বেগমের এই অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব শরীয়তপুরে প্রশাসনকে মানুষের কাছাকাছি এনে দিয়েছে।

৫. শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য: উন্নয়নের তিন স্তম্ভ:
একটি কন্যা শিশুর পূর্ণ বিকাশের জন্য তিনটি উপাদান অপরিহার্য-শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা। জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে শরীয়তপুরে এখন প্রতিটি বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে স্যানিটারি প্যাড বিতরণ, পুষ্টি সচেতনতা ক্যাম্প, এবং মা-শিশু স্বাস্থ্যসেবা শিবির চালু হয়েছে। তাহসিনা বেগম প্রশাসনের নির্দেশনায় এসব কার্যক্রম শুধু স্বাস্থ্য উদ্যোগ নয়, এটি একটি মানবিক সুরক্ষা চাদর-যা কন্যা শিশুকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে।

৬. প্রযুক্তিতে মেয়েদের অংশগ্রহণ: নতুন প্রজন্মের দক্ষতা: ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে এখন স্মার্ট বাংলাদেশের পথে দেশ এগোচ্ছে। এই রূপান্তরে মেয়েদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তাহসিনা বেগম শরীয়তপুরের মেয়েদের জন্য যে “ডিজিটাল স্কিল ক্যাম্পেইন” চালু করেছেন, তা প্রশংসনীয়। গ্রামীণ স্কুলগুলোতে ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন এবং প্রশিক্ষকদের মাধ্যমে মেয়েদের কম্পিউটার জ্ঞান শেখানো হচ্ছে।

এই উদ্যোগ কন্যা শিশুর আত্মনির্ভরশীলতা ও কর্মসংস্থান— দুই দিকেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
কারণ, প্রযুক্তি শিক্ষিত মেয়ে শুধু পরিবারের নয়, সমাজেরও সম্পদ হয়ে ওঠে।

৭. কন্যা শিশুর নিরাপত্তা: প্রশাসনের শূন্য সহনশীলতা নীতি: বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানি বা সহিংসতার ক্ষেত্রে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসন এখন “জিরো টলারেন্স” নীতি অনুসরণ করছে। প্রতিটি থানায় কন্যা শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বিশেষ মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। পুলিশ, শিক্ষা কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা একসাথে কাজ করছেন।
তাহসিনা বেগম নিজে বলেন- “একটি মেয়ের চোখের জলই যথেষ্ট, একটি জেলার বিবেক জাগানোর জন্য।”
এই বার্তাই তার প্রশাসনিক নীতির প্রতিফলন।
নারীর নিরাপত্তাকে উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তিনি বাস্তবায়ন করেছেন।

৮. গণমাধ্যম ও সামাজিক সচেতনতা: কন্যা শিশু দিবস উপলক্ষে শরীয়তপুরের স্থানীয় পত্রিকা, টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা হয়। জেলা প্রশাসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “#আমার_কন্যা_আমার_গর্ব” হ্যাশট্যাগ চালু করে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
এই প্রচারণা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করেছে এবং পরিবারে মেয়েদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিচ্ছে।

৯. দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা: কন্যা শিশুবান্ধব জেলা গঠন: তাহসিনা বেগমের নেতৃত্বে প্রশাসন এখন কাজ করছে একটি মহাপরিকল্পনা নিয়ে- “কন্যা শিশুবান্ধব শরীয়তপুর জেলা গঠন।”
এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—

১️⃣ প্রতিটি ইউনিয়নে কন্যা শিশু সহায়তা ডেস্ক,
২️⃣ কিশোরী ক্লাব ও ডিজিটাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র,
৩️⃣ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ অ্যাপ,
৪️⃣ মেধাবী কন্যাদের বৃত্তি ও উদ্যোক্তা সহায়তা।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শরীয়তপুর সারা দেশের জন্য একটি মডেল জেলা হয়ে উঠবে।

১০.তাহসিনা বেগমের নেতৃত্বে স্বপ্নের ভবিষ্যৎ: একজন নেতার কাজ শুধু প্রশাসন চালানো নয়; তার কাজ মানুষকে অনুপ্রাণিত করা। তাহসিনা বেগম সেই অর্থে একজন অনুপ্রেরণাদাত্রী— যিনি শরীয়তপুরের প্রতিটি কন্যা শিশুকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, “তুমি পারবে- কারণ তুমি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।”
জাতীয় কন্যা শিশু দিবস-২০২৫-এর কার্যক্রম শরীয়তপুরে এক মানবিক জাগরণের রূপ নিয়েছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা— সবক্ষেত্রেই উন্নয়নের ধারা শুরু হয়েছে।

আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি,
জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমের দূরদর্শী নেতৃত্বে
শরীয়তপুর শিগগিরই হয়ে উঠবে বাংলাদেশের প্রথম “কন্যা শিশুবান্ধব জেলা”।

এটি হবে এক অনন্য অর্জন, যা শুধু প্রশাসনের নয়— বরং গোটা জাতির গর্ব। লেখক: শহীদুল ইসলাম পাইলট, সম্পাদক ও কলাম লেখক।