ঠাকুরগাঁওয়ের চারটি উপজেলায় নতুন নিয়োগ পাওয়া ৩১ জন সার ডিলারের মধ্যে ২৮ জনই বিএনপি-সংশ্লিষ্ট বলে তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে দলীয় বিবেচনা ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অনভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং নেতাদের স্ত্রী-সন্তানদের এই ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে।

গত ৪ নভেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখা থেকে বালিয়াডাঙ্গী, রানীশংকৈল, হরিপুর ও পীরগঞ্জ উপজেলার ২৯টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভায় এই ডিলার নিয়োগের চিঠি দেওয়া হয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে বিএনপি নেতাদের নয়জন স্ত্রী, চারজন সন্তান এবং তিনজন ভাই ও স্বজন রয়েছেন। এ ছাড়া দল ও অঙ্গসংগঠনের পদধারী দশজন নেতা, একজন সমর্থক এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের এক ঘনিষ্ঠজন ডিলারশিপ পেয়েছেন। বাকি তিনজনের মধ্যে একজন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা এবং দুজন রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।

নতুন এই তালিকায় বিএনপি নেতাদের স্ত্রী ও সন্তানদের প্রাধান্য দেখা গেছে। পীরগঞ্জ পৌরসভায় উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রেজওয়ানূল হকের স্ত্রী শ্যামলী আক্তার এবং রানীশংকৈল পৌরসভায় পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মহসিন আলীর স্ত্রী পারুল বেগম ডিলার হয়েছেন। স্থানীয়দের দাবি, তাঁদের কারোরই আগে সারের ব্যবসা ছিল না।

এ ছাড়া পীরগঞ্জের ভোমরাদহ, খনগাঁও, হাজীপুর, কাশিপুর এবং বালিয়াডাঙ্গীর পারিয়া, ধনতলা ও বড়বাড়ী ইউনিয়নে স্থানীয় বিএনপি ও যুবদল নেতাদের স্ত্রীরা ডিলারশিপ পেয়েছেন। অন্যদিকে পীরগঞ্জ, জাবরহাট, লেহেম্বা ও আমগাঁও ইউনিয়নে ডিলার হয়েছেন বিএনপি নেতাদের চার সন্তান।

প্রবাস থেকে ফিরেই ডিলারশিপ পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। রানীশংকৈলের রাতোর ইউনিয়নে ডিলারশিপ পেয়েছে গত ৫ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফেরা জাহাঙ্গীর আলমের প্রতিষ্ঠান। জাহাঙ্গীর জানান, তাঁর ছোট ভাই ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিলন মাহমুদের পরামর্শে তিনি আবেদন করেছিলেন।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আর্থিক লেনদেন ও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বঞ্চিত করার অভিযোগ তুলেছেন খোদ বিএনপিরই পদধারী নেতারা। বালিয়াডাঙ্গীর ভানোর ইউনিয়নে ২৭ বছর ধরে সার ব্যবসা করেও ডিলারশিপ পাননি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আবদুল ওহাব। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “সারের ডিলার নিয়োগে দুর্নীতি হয়েছে। যার টাকা নেই, তার ডিলারশিপও নেই।”

একই অভিযোগ হরিপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলামের। গেদুরা ইউনিয়নে আবেদন করা এই নেতা দাবি করেন, ডিলার হতে তিনি টাকা দিয়েও চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। রানীশংকৈলের বটতলী বাজারের ব্যবসায়ী জয়নাল আলী জানান, যাঁদের মনোনীত করা হয়েছে তাঁদের অনেকেরই নির্ধারিত ধারণক্ষমতার গুদাম ও ব্যবসার অভিজ্ঞতা নেই।

এ বিষয়ে জাতীয় কৃষক শক্তির সদস্যসচিব গোলাম মর্তুজা সেলিম বলেন, ডিলার নিয়োগে এমন দলীয়করণের ফলে একদিকে কৃষিব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে, অন্যদিকে সার সরবরাহের চেইন সিন্ডিকেটে রূপ নিতে পারে।

তবে দলীয় প্রভাবের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন দলের নেতা-কর্মীরা বঞ্চিত থাকায় এখন অনেকে ব্যবসায় মনোযোগ দিচ্ছেন এবং সে কারণেই আবেদন করেছেন। রানীশংকৈল পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মহসিন আলী এবং হরিপুরের ভাতুরিয়া ইউনিয়নে ডিলার হওয়া জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমা পারভীনও দাবি করেন, যথাযথ কাগজপত্র ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই তাঁরা মনোনীত হয়েছেন।

ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম নিয়োগে নিজের ভূমিকার কথা অস্বীকার করে বলেন, “ডিলার নিয়োগ ইউএনও ও ডিসির মাধ্যমে হয়েছে, অনিয়ম হলে সেটা তাদের দায়। তবে আওয়ামী লীগের যিনি নিয়োগ পেয়েছেন, তিনি আমার নির্বাচনে কাজ করেছিলেন।” নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটে থাকলে তা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দেবেন বলে জানান তিনি।

সংসদ সদস্যের মন্তব্যের বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি জেলা প্রশাসক ও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ রফিকুল হক। তবে তিনি দাবি করেন, নীতিমালা অনুযায়ী স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে পরামর্শ করে উপজেলা কমিটি যে সুপারিশ করেছে, তা অপরিবর্তিত রেখেই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি বলেও জানান জেলা প্রশাসক।