মঙ্গলবার, ২০শে এপ্রিল, ২০২১ ইং, ৭ই বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৮ই রমজান, ১৪৪২ হিজরী
মঙ্গলবার, ২০শে এপ্রিল, ২০২১ ইং

শরীয়তপুরে চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের রায় প্রত্যাখ্যান করে এবার আইনজীবীদের আদালত বর্জন

শরীয়তপুরে চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের রায় প্রত্যাখ্যান করে এবার আইনজীবীদের আদালত বর্জন

শরীয়তপুরে বহুল আলোচিত চাঞ্চল্যকর পিপি অ্যাড. হাবিবুর রহমান মুন্সী ও তার ভাই মনির হোসেন মুন্সী হত্যা মামলার রায়ের পর থেকেই উত্তাল ওয়ে ওঠে শরীয়তপুর। এ রায় প্রত্যাখ্যান করে মামলার বাদী পক্ষ ও জেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনগুলো বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও হরতালের মতো কঠোর কর্মসুচি পালন করে।

এবার আইনজীবীরাও এই রায় প্রত্যাখ্যান করে কোর্ট বর্জন ও অনির্দিষ্ট কালের জন্য অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. শওকত হোসেনের বিচারকার্য বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।

মঙ্গলবার (২৩ মার্চ) সকাল থেকে কোর্ট বর্জন করে আইনজীবীরা কোর্ট এলাকায় বিচারকের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। বিক্ষোভ মিছিল শেষে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এড. জহিরুল ইসলাম মঙ্গলবার সারাদিন জেলার সকল বিচারিক আদালত বর্জন ও অনির্দষ্ট কালের জন্য শুধুমাত্র অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. শওকত হোসেনের আদালত বর্জনের ঘোষণা দেন।

দীর্ঘ ২০ বছর পর রোববার (২১ মার্চ) দুপুর ২ টায় শরীয়তপুরের বহুল আলোচিত চাঞ্চল্যকর পিপি অ্যাড. হাবিবুর রহমান মুন্সী ও তার ভাই মনির হোসেন মুন্সী হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. শওকত হোসাইন।

এ রায়ে ৫৩ জন আসামীর মধ্যে ৬ জনের ফাঁসি, ৪ জনের যাবজ্জীবন ও ৩ জনের দুই বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। বাকি আসামীদের খালাস দেওয়া হয়।

গুরুত্বপূর্ণ ৪০ জন আসামীকে খালাস দেয়ায় এ রায় প্রত্যাখান করে বিক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে বাদী পক্ষ, জেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনগুলো।

রায় ঘোষনার পরপরই তা প্রত্যাখ্যন করে বিচারকের বিরুদ্ধে শহরের বিক্ষোভ মিছিল ও টায়ার জ্বালিয়ে ঘন্টাব্যাপী সড়ক অবরোধ করে রাখে জেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং অ্যাড. হাবিবুর রহমান মুন্সী ও মনির হোসেন মুন্সীর সমর্থকরা। সোমবার সকাল ৬টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত তারা পৌরসভায় হরতাল পালন করে।

জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এড. জহিরুল ইসলাম বলেন, চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ আসামী যাদের ফাঁসি হওয়ার কথা ছিলে তাদের খালাস দেয়া হয়েছে, আবার যাদের সাজা কম হওয়ার কথা ছিলো তাদের ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়েছে। আমরা জানতে পেরেছি বিচারক মোটা অংকের ঘুষ খেয়ে মনগড়া রায় দিয়েছে। জেলার আইনজীবীরা এই রায় মানে না। এই রায়ের প্রতিবাদে আমরা মঙ্গলবার সারাদিন কোর্ট বর্জন করেছি এবং অনির্দষ্ট কালের জন্য শুধুমাত্র অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. শওকত হোসেনের আদালত বর্জনের ঘোষণা করছি।

অ্যাড. হাবিবুর রহমান মুন্সী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও জেলা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ছিলেন এবং তার ভাই মনির হোসেন মুন্সী শরীয়তপুর পৌরসভা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন।

অ্যাড. হাবিবুর রহমান মুন্সীর বড় ছেলে অ্যাড. পারভেজ রহমান জন শরীয়তপুর পৌরসভার নবনির্বাচিত মেয়র ও জেলা জজ আদালতের এপিপি।

অ্যাড. পারভেজ রহমান জন বলেন, আমার বাবা ও চাচাকে জনসম্মুখে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার সাথে সরাসরি যারা জড়িত ছিল তাদের ফাঁসির রায় না দিয়ে যাবজ্জীবন ও খালাস দেওয়া হয়েছে। এ রায় আমরা মানিনা। এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।

মামলার এজাহার ও বাদীর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শরীয়তপুর-১ (পালং-জাজিরা) আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন জাজিরা উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মোবারক আলী সিকদার এবং বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী ছিলেন হেমায়েত উল্লাহ আওরঙ্গ। তখন স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশ বিদ্রোহী প্রার্থী আওরঙ্গের পক্ষে অবস্থান নেন। ১ অক্টোবরের ওই নির্বাচনে সহিংসতার কারনে জাজিরা উপজেলার কয়েকটি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয় এবং পরবর্তী ৮ অক্টোবর স্থগিত হওয়া কেন্দ্রে পূনরায় ভোট গ্রহণের দিন ধার্য করে নির্বাচন কমিশন। ৫ অক্টোবর নৌকার পক্ষে শহরের নিজ বাড়িতে নেতাকর্মীদের নিয়ে সভা করছিলেন অ্যাড. হাবিবুর রহমান। ওই সভায় বিদ্রোহী প্রার্থী আওরঙ্গ’র সমর্থক আওয়ামী লীগের একটি বিদ্রোহী গ্রুপ অতর্কিত গুলিবর্ষণ করে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন অ্যাড. হাবিবুর রহমান ও তাঁর ভাই মনির মুন্সী।

পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় হাবিবুর রহমানের স্ত্রী জিন্নাত রহমান বাদী হয়ে আওরঙ্গসহ মোট ৫৫ জনকে আসামি করে পালং থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হেমায়েত উল্লাহ আওরঙ্গ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিএনপি সরকার গঠন করে। ২০০৩ সালে সংসদ সদস্য আওরঙ্গ’র নাম বাদ দিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। মামলার বাদী তখন আদালতে নারাজি দেন। আদালত ওই আবেদন নামঞ্জুর করেন। এরপর বাদী উচ্চ আদালতে রিট করেন। ২০১৩ সালের ৩ আগস্ট সড়ক দুর্ঘটনায় আওরঙ্গ মারা যান। এরপর উচ্চ আদালত মামলাটি পুনরায় তদন্ত করে পুলিশকে অভিযোগপত্র দাখিলের নির্দেশ দেন। আওরঙ্গ সহ তিন আসামী মারা যাওয়ায় পুলিশ তদন্ত শেষে ২০১৩ সালের অক্টোবরে ৫৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

এরপর চার্জ গঠন করে মামলার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। ২৮ জন স্বাক্ষীর স্বাক্ষ গ্রহণ শেষে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামী পক্ষের যুক্তিতর্ক শোনা হয়। কয়েক দফায় রায়ের তারিখ পেছানোর পরে অবশেষে বহুল আলোচিত চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের রায় ঘোষণা করে আদালত।

এই রায়ের বিরুদ্ধে বাদী ও আসামী উভয় পক্ষ উচ্চ আদালতে আপিল করার ঘোষনা দিয়েছেন।