শনিবার, ১৫ই আগস্ট, ২০২০ ইং, ৩১শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৫শে জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী
শনিবার, ১৫ই আগস্ট, ২০২০ ইং

নড়িয়ায় গৃহবধুকে শশুরবাড়িতে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার অভিযোগ

নড়িয়ায় গৃহবধুকে শশুরবাড়িতে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার অভিযোগ
নড়িয়ায় গৃহবধুকে শশুরবাড়িতে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার অভিযোগ

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের পাচগাও গ্রামের সুমাইয়া আক্তার(১৯) নামে এক গৃহবধুকে শশুরবাড়িতে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার অভিযোগ ওঠেছে। সুমাইয়া আক্তার নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের পাচগাও গ্রামের ইতালি প্রবাসী আ: রব শেখের একমাত্র কন্যা। গত ২ এপ্রিল ২০১৮ সালে শরাহ্ শরীয়ত মোতাবেক ও কাবিন মূলে একই গ্রামের দুলাল মাদবরের ছেলে জুলহাস মাদবর(৩০) সাথে বিবাহ হয়। বিবাহের পর থেকেই সুমাইয়া শশুর বাড়িতে বসবাস করিতে থাকে। এর কিছুদিন পর স্বামী জুলহাস মাদবর বিদেশ চলিয়া যায়। স্বামী বিদেশ যাওয়ার পরেও সুমাইয়া শশুর শাশুড়ি ও ননদের সাথে শ্বশুর বাড়িতেই অবস্থান করে। স্বামী জুলহাস বিদেশ যাওয়ার পরে ঢাকায় বাড়ি কেনার জন্য শ্বশুরবাড়ি থেকে যৌতুক চায়। সুমাইয়ার বাবা নগদ পাঁচ লক্ষ টাকা সুমাইয়ার শশুরকে দেয়। কিন্তু তারা আরো দশ লক্ষ টাকা দাবি করে। এ নিয়ে বিয়ের পর থেকেই সুমাইয়ার সাথে তার স্বামী জুলহাস মাদবরের প্রায়ই ঝগড়া বিবাদ হতো। তাছাড়া, জুলহাস মাদবর অন্য একটি মেয়ের সাথে মেসেঞ্জারে ও মোবাইলে কথোপকথন করতো। সুমাইয়ার সাথে এ বিষয় নিয়েও স্বামী জুলহাস মাদবরের বাড়ির লোকজন শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হতো। স্বামী জুলহাস মাদবরসহ শশুর-শাশুড়ী, ননদেরা অনেক সময় বিরক্তিবোধ করতো। এছাড়া, সুমাইয়ার ননদ আলো বেগমের পরকিয়ার বিষয় নিয়েও ননদের সাথে ঝগড়া হতো। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতো না বলে, স্বামী, শশুড়-শাশুড়ী ও ননদের এক প্রকার প্রতিপক্ষ হয়ে দাড়িয়েছে। জানা যায়, যৌতুক ও পরকিয়া মেনে নিতে পারে নাই বলে সুমাইয়াকে স্বামী জুলহাস মাদবর(৩০) ও তার শশুর দুলাল মাদবর(৫৮) এবং শাশুড়ী সেলিনা বেগম(৪৫)-এর হুকুমে কৌশলে দুলাল মাদবরের মেয়ে আলো বেগম(২২), মোহরচান মাদবরের ছেলে মতিউর রহমান মাদবর(২৫), মোহরচান মাদবরের মেয়ে আছিয়া বেগম(১৯), প্রিয়াঙ্কা(২০), মৃত-পন্ডিত মাদবরের ছেলে সিরাজ মাদবর(৫৫) ও মৃত-লাল মিয়া মাদবরের ছেলে মোহরচান মাদবর(৫৭) মিলে গলায় ওড়না পেছিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার চেষ্টা করে। ঐ সময় সুমাইয়ার আত্মচিৎকারে আশেপাশের বাড়ির লোকজন আসিয়া পড়ায়, আর হত্যা করতে পারিনি। সুমাইয়া ততক্ষণে তার জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এবং কথা বলতে অক্ষম হয়ে পড়ে। যার কারণে সুমাইয়ার কাছে আশেপাশের লোকজন কিছুই জানতে পারেনি। তৎক্ষণাৎ অসুস্থ সুমাইয়াকে বাঁচাতে হত্যাকারীরাসহ আশেপাশের লোকজন শুক্রবার রাত ১১টায় মুলফৎগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করে। সুমাইয়ার অবস্থা মারাত্মক দেখে ডা. তৌহিদুল ইসলাম তাকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে রেফার করে। ডা. তৌহিদুল ইসলাম ভর্তির সময় কৌতূহল বশত সুমাইয়ার সাথে আসা লোকজনকে জিজ্ঞাসা করেন, রোগীকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে কিনা? তখন সুমাইয়ার সাথে আসা লোকজন চুপচাপ ছিল ও অবাক হয়ে ডা. তৌহিদুল ইসলামের দিকে তাকিয়ে ছিল। শরীয়তপুর সদর হাসপাতালও সুমাইয়ার অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে রাত ২টায় ঢাকা মেডিকেলে রেফার করে। ইতিমধ্যে, সুমাইয়ার শশুরবাড়ির লোকজন তার মা মাফিয়া বেগমকে রাত সাড়ে ১১টায় সুমাইয়ার আশঙ্কাজনক অবস্থার কথা জানায় যে, সুমাইয়া গলায় ওড়না দিয়ে নিজে গলায় ফাঁস দিয়েছে। সুমাইয়ার মা মেয়ের আশঙ্কাজনক অবস্থার কথা শুনে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ছুটে আসে। হাসপাতালে এসে দেখে সুমাইয়াকে অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেছে। পরের দিন শনিবার সুমাইয়ার মা ও ভাইসহ আত্মীয়স্বজন সুমাইয়াকে দেখতে ঢাকা মেডিকেলে যায়। কিন্তু সুমাইয়া অজ্ঞান থেকেই মৃত্যুবরণ করায়, মা ও ভাইসহ আত্মীয়স্বজন কি ঘটনা ঘটেছে জানতে পারেনি! সুমাইয়া শনিবার ঢাকা মেডিকেলে মৃত্যু বরণ করে। শাহবাগ থানায় এফআইআর করে ঢাকা মেডিকেলে পোস্টমর্টেম শেষে রবিবার জানাজা শেষে কেদারপুর গণ কবরস্থানে সুমাইয়ার দাফন সম্পন্ন হয়।

এ বিষয়ে সুমাইয়ার মা মাফিয়া বেগম সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসাবাদে জানান, আমার মেয়ে সুমাইয়া শুক্রবার রাত ১০টায় আমার সাথে মোবাইলে কথা বলেছে। আমার মেয়ে পরেরদিন আমার বাড়িতে আসার কথা ছিল। আমি সুমাইয়াকে জিজ্ঞাসা করেছি। মা তুমি বাড়িতে আসলে কি খাইবা? সুমাইয়া বলেছে, মা আমি বিরানি খাব। আমার মেয়ের আর বিরানি খাওয়া হলো না। ওর শশুরবাড়ির লোকজন ওরে মাইরা ফালাইলো। মাফিয়া বেগম মেয়ে মরার আহাজারিতে বারবার মূর্ছা যায়। কি কারনে এ ঘটনা ঘটেছে জানতে চাইলে বলেন, যৌতুক ও সুমাইয়ার স্বামীর গোপন কথা এবং সুমাইয়ার ননদ আলোর পরকিয়ার বিষয় নিয়ে আমার মেয়েকে প্রায়ই ওরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতো। এই কারনেই আমার মেয়েকে জুলহাস মাদবর(৩০) ও তার শশুর দুলাল মাদবর(৫৮) ঢাকা মেডিকেলে শাশুড়ী সেলিনা বেগম(৪৫)-এর হুকুমে কৌশলে দুলাল মাদবরের মেয়ে আলো বেগম(২২), মোহরচান মাদবরের ছেলে মতিউর রহমান মাদবর(২৫), মোহরচান মাদবরের মেয়ে আছিয়া বেগম(১৯), প্রিয়াঙ্কা(২০), মৃত-পন্ডিত মাদবরের ছেলে সিরাজ মাদবর(৫৫) ও মৃত-লাল মিয়া মাদবরের ছেলে মোহরচান মাদবর(৫৭) ষড়যন্ত্র করে হত্যা করেছে।

সুমাইয়ার ভাই রায়হানসহ আত্মীয়রা বলেন, এই হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত। সুমাইয়াকে ষড়যন্ত্র করে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে।

শ্বশুর-শাশুড়িকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি।

সুমাইয়ার ননদ আলো বেগম জানান, আমার ভাই, ভাবি এবং আমাদের কারো সাথে কোন ধরনের ঝগড়া-বিবাদ ছিল না। কি কারনে ভাবি গলায় ফাঁস দিল বলতে পারিনা। পরে কোথায় ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়েছে সাংবাদিকরা দেখতে চাইলে? আলো বেগম সুমাইয়ার ফাঁসের স্থান দেখান। কিন্তু ওখানে সঠিকভাবে কোন শনাক্তকারী স্থান সাংবাদিকদের দেখাতে পারেনি আলো বেগমরা।

এ হত্যাকান্ড বিষয়ে নড়িয়া থানায় কোন অভিযোগ নেয়নি। এ বিষয়ে নড়িয়া থানা ওসি হাফিজ বলেন, অন্য থানার রিপোর্টে পোস্টমর্টেম হলে আমরা রিপোর্ট না পেতে মামলা নিতে পারি না। পরে বিলম্বে শরীয়তপুর কোর্টে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে ১৫ নভেম্বর সকাল ১০টায় সুমাইয়ার মা মাফিয়া বেগম বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন।