ঢাকা-শরীয়তপুর ও নড়িয়া-শরীয়তপুর সড়কের পাশাপাশি ভেদরগঞ্জ, ডামুড্যা ও গোসাইরহাটের সংযোগস্থল হওয়ায় প্রতিদিন হাজারো মানুষের কোলাহলে মুখর থাকে শরীয়তপুর পৌরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের বাঘিয়া এলাকার ‘প্রেমতলা’। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও কার্যালয়, অন্তত ৩০টি কারখানাসমৃদ্ধ বিসিক শিল্পনগরী এবং প্রায় ১২০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কারণে এটি আজ শহরের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। অথচ সাড়ে তিন দশক আগেও কোলাহলপূর্ণ এই জনপদটি ছিল ফসলের মাঠের বুক চিরে চলে যাওয়া নিতান্তই এক নির্জন মেঠোপথ।

গ্রামীণ সেই প্রান্তরটির ‘প্রেমতলা’ হয়ে ওঠার নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় কিশোর-তরুণদের খেলাধুলা, আড্ডা ও পথচারীদের বিভ্রান্তি দূর করার এক চমৎকার গল্প। মূলত এই স্থান এবং এখান থেকে প্রায় ৭৫০ মিটার পশ্চিমে কীর্তিনাশা নদীর তীরের আরেকটি গ্রামের নাম ‘কোটাপাড়া’ হওয়ায় প্রায়ই বিপাকে পড়তেন যানবাহনের চালক ও সাধারণ মানুষ। এই বিড়ম্বনা ঘোচাতে ১৯৯০ সালের নভেম্বরের এক বিকেলে পথের পাশের বিশাল বটগাছের ছায়ায় নিয়মিত আড্ডায় বসা বাঘিয়া ও কোটাপাড়ার তরুণদের কাছে জায়গাটির নাম ‘প্রেমতলা’ রাখার প্রস্তাব দেন স্থানীয় বাসিন্দা মকবুল চৌকিদার। সবাই তাতে সায় দিলে পরদিনই বটগাছে ‘প্রেমতলা বাসস্ট্যান্ড’ লেখা একটি টিনের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, যা কালক্রমে এলাকাটির স্থায়ী পরিচয়ে রূপ নেয়।

নামকরণের প্রস্তাব দেওয়া মকবুল চৌকিদার বর্তমানে প্রেমতলা বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। গণমাধ্যমের কাছে পুরোনো দিনের স্মৃতি হাতড়ে তিনি জানান, ৩৬ বছর আগে অজপাড়াগাঁয়ের ফসলি মাঠের মেঠোপথকে ঘিরে তাঁদের কয়েকজনের দেওয়া নামটি যে ভবিষ্যতে এমন জনবহুল শহুরে জনপদে পরিণত হবে, তা সেদিন কেউ কল্পনাও করেননি। ১৯৯০ সালে যাত্রা শুরু করা সেই বাসস্ট্যান্ডে প্রথম দিকে কেবল দুটি চায়ের দোকান ছিল।

এলাকাটির এমন রূপান্তরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শরীয়তপুরের যোগাযোগব্যবস্থার বিবর্তনও। ফরিদপুরের সাবেক এই মহকুমাটি ১৯৮৪ সালের মার্চে জেলায় উন্নীত হওয়ার পরের বছরই শরীয়তপুর পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯৮৮ সালের বন্যায় শহর থেকে বাঘিয়ামুখী কাঁচা রাস্তাটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সংস্কারের সময় সেখানে ইট বিছানো হয় এবং রিকশা-ভ্যানের পাশাপাশি বাস চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়। ১৯৮৯ সালে সদর উপজেলার আঙ্গারিয়া নদীর ঘাট থেকে প্রেমতলা হয়ে নড়িয়ার বাঁশতলা পর্যন্ত প্রায় ২৭ কিলোমিটার পথে জেলায় প্রথমবারের মতো বাস সার্ভিস চালু হয়।

ঐতিহাসিক ওই রুটের তৎকালীন বাসচালক সবুজ ভূঁইয়া দশ বছর আগে পেশা ছাড়লেও গত ২৭ অক্টোবর এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে প্রিয় জায়গাটিতে এসে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। সেদিনের সেই বিশাল বটতলায় বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামার দৃশ্য তাঁর কাছে আজও “এই তো সেদিনের কথা” বলে মনে হয়। অন্যদিকে, নিজের সাবেক ফসলি জমিতেই গত ২০ বছর ধরে চা ও কনফেকশনারির দোকান চালাচ্ছেন সত্তরোর্ধ্ব আবদুর রব হাওলাদার। তিনি জানান, ৩৬ বছর আগে রাস্তার দুই পাশের ক্ষেতের ফসল বাসে করে বিভিন্ন হাটবাজারে নিয়ে গেলেও সময়ের পরিক্রমায় কৃষিকাজ ছেড়ে তিনি ব্যবসায় নেমেছেন, আর চোখের সামনেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা।

তবে যে বটবৃক্ষের ছায়ায় বসে ক্লান্ত পথচারীরা জিরিয়ে নিতেন এবং যেখান থেকে ‘প্রেমতলা’ নামের জন্ম, প্রায় এক দশক আগে সেই গাছটি কেটে ফেলা হয়েছে। শরীয়তপুর সদরের বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক পলাশ চন্দ্র রায়ের স্মৃতিতে আজও অমলিন হয়ে আছে ৩৬ বছর আগের সেই মেঠোপথ, বটতলার শীতল ছায়া আর দখিনা বাতাসের দিনগুলো। মাঝেমধ্যে বন্ধুদের সাথে এখানে চায়ের আড্ডায় বসে তিনি অনুভব করেন—ইট-পাথরের যান্ত্রিক নগরায়ণে গ্রামীণ নিসর্গ হারিয়ে গেলেও কিশোর-তরুণদের দেওয়া নামটির মাঝেই বেঁচে আছে হারানো দিনের গল্প।