মঙ্গলবার, ৫ই জুলাই, ২০২২ ইং, ২১শে আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৫ই জিলহজ্জ, ১৪৪৩ হিজরী
মঙ্গলবার, ৫ই জুলাই, ২০২২ ইং

পরিবেশ ও তরুণ জলবায়ু যোদ্ধাদের প্লাটফর্ম ইয়ুথনেট

পরিবেশ ও তরুণ জলবায়ু যোদ্ধাদের প্লাটফর্ম ইয়ুথনেট

সমসাময়িক কালে বিশ্ব তিনটি গুরতর গ্রহজনিত সংকটের মুখোমুখি। পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু সংকট ও প্রাণ বৈচিত্র্যের বিলুপ্তি বিশ^কে খাদের কিনারায় নিয়ে এসেছে। সবচাইতে বিপদের মুখে থেকেও সংকট মোকাবিলায় অগ্রগামী তরুণ সম্প্রদায়। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের দেশগুলোতে জলবায়ু আন্দোলন এখন তুঙ্গে। লাখো লাখো স্কুল পড়ুয়া তরুণ, কিশোর-কিশোরীরা তাদের ভবিষ্যতের সুরক্ষার দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন ও জলবায়ু অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে প্রতি শুক্রবারে। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর ভূমিকা নিতে বিশ্ব নেতাদের বাধ্য করানোর এ যুব আন্দোলনের নাম ‘ফ্রাইডেস ফর ফিউচার’। রাজপথের আন্দোলন থেকে সংসদ, পিছিয়ে নেই বাংলাদেশের তরুণ যোদ্ধারা।

পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু সুবিচার আদায়ে দেশের সর্বোবৃহৎ প্লাটফর্ম ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস শহর থেকে গ্রামে সংগঠিত করছে হাজারো তরুণকে।  ‘নিরাপদ ধরিত্রী সবুজ অরণ্য, নিশ্চিত করবে দুর্জয় তারুণ্য’ হচ্ছে ওদের মূলমন্ত্র। উপকূলীয় শহর বরিশালে গড়ে ওঠা সংগঠনটি তৃণমূলের তরুণদের যেমনি সংগঠিত করেছে তেমনি সম্পৃক্ত করেছে সংসদ সদস্যদেরও। তরুণ জলবায়ু যোদ্ধাদের আন্দোলনকে স্বীকৃতি দিয়েছে সংসদ, গ্রহণ করেছে গ্রহজনিত জরুরী অবস্থা বিষয়ক বিল। ইয়ুথনেটের প্রতিষ্ঠার ৬ বছরে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায় ১৫ হাজার প্রশিক্ষিত সদস্য নিয়ে গড়ে উঠেছে পৃথিবী বাঁচানোর আন্দোলন। যে আন্দোলনের উত্তাপ পৌঁছে গেছে দেশের সীমানা পেরিয়ে বর্হিবিশে^ রাজপথেও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রচারণায় সংযুক্ত হয়ে সবুজের বার্তা পেয়েছে বিশে^র কোটি মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায়ে নানামুখী প্রচারাভিযান, অধিপরামর্শ ও পরিবেশবাদী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ অর্জণ করেছে জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড, নাসরীন স্মৃতি পদক, ইএনডিপির নির্ভয়া পদকের মত সম্মাননা। নেটওর্য়াকটি জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় তরুণদের দাবি সম্পৃক্ত করণের পাশাপাশি সফল হয়েছে জাতীয় পাঠক্রমে পরিবেশ ও জলবায়ুকে অন্তভুক্ত করতে। কমনওয়েলথ ও জাতিসংঘ জলবায়ু  সম্মেলন কপে অংশ নিয়ে দেশের বিপদাপন্ন মানুষের দু:খগাঁথা ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প তুলে ধরেছে নেটওর্য়াকটি।

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব মোকাবিলা এবং টেকসই পরিবেশ উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখার প্রত্যয় নিয়ে ২০১৬ সালে কীর্তনখোলা পাড়ের এক দল তরুণ শুরু করেছিল সবুজের প্লাটফর্ম ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস। স্থানীয় যুব সংগঠক সোহানুর রহমানের নেতৃত্বে উপকূলীয় এক প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে প্রামাণ্য চিত্র ধারনের জন্য তরুণ দলটি গিয়েছিল পটুয়াখালির রাঙ্গাবালি উপজেলার চরে আন্ডায়। জলবায়ু সংকটে আক্রান্ত দুর্গম দ্বীপসমূহ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনমানের দুরঅবস্থা দেখে মনে দাগ কাটে সেই তরুণদের। বিপদাপন্ন মানুষ বিশেষ কওে নারী ও শিশুদেও জন্য জলবায়ু সুবিচার আদায়ে মাঠে নেমে পড়ে ওরা। তৃণমূলের কন্ঠস্বর নীতিনির্ধারকদের কর্ণকুহরে পৌঁছে দিতে গড়ে তোলে ‘ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস’ নামের একটি যুব নেতৃত্বের  নেটওয়ার্ক।

২০১৭ সালে বরিশাল শহরে প্রথমবারের মত যুব জলবায়ু সম্মেলন আয়োজনের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটলেও ইয়ুথনেটের প্রাথমিক কাজ ছিল নতুন সদস্যদের জলবায়ু ও পরিবেশ বিষয়ক জ্ঞান এবং দক্ষতার বিকাশ ঘটানো। সম্মেলনটিতে দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক অধিবেশনের পাশাপাশি তৃণমূলের তরুন প্রতিনিধিদের সম্বন্বয়ে গৃহীত হয় বরিশাল যুব জলবায়ু ঘোষনাপত্র। পরবর্তীতে যুব ঘোষণাপত্রটি জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার, পরিবেশ বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটির সামনে উপস্থাপন করা হলে ব্যাপক প্রশংসা পায় ইয়ুথনেট। অধিপরামর্শের পাশাপাশি বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাধ্যমে ইয়ুথনেট উপকূলের প্রত্যন্ত উপজেলাগুলোতে প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করে তরুণদের জলবায়ু কার্যক্রমের জন্য প্রস্তুত করে তোলে। প্রশিক্ষিত তরুণরা স্থানীয় প্রশাসনকে সাথে নিয়ে বাস্তবায়ন করে স্থানীয় পরিবেশ ও জলবায়ু কার্যক্রম বিষয়ক কর্মপরিকল্পনা। যার আওতায় ইয়ুথনেটের সদস্যরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে উপকূলীয় এবং প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের তরুনদের দক্ষতা উন্নয়ন ও তাদের ক্ষমতায়নে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। চরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠি বিশেণ করে ভাসমান মান্তা সম্প্রদায়ের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি যেকোন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সর্তকীকরণ বার্তা প্রদান এবং বিভিন্ন মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে ইয়ুথনেট। অর্ধশত প্রশিক্ষিত ফেলো, মাস্টার ফ্যাসিলেটর ও ফ্যাসিলেটর সারা দেশের কর্মযজ্ঞকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় কমিটির তত্বাবধানে। ইয়ুথনেটের আর একটি গুরুত্বপুর্ণ প্রচারাভিযান হচ্ছে পাবলিক প্লেসে নারীর প্রতি সহিংসতা রুখে দেয়া। বরিশাল থেকে শুরু হলেও নানামুখী কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। জলবায়ু সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সামাজিক নিরীক্ষা পরিচালনা, ক্লাইমেট পার্লামেন্টের সংসদ সদস্যদের নিয়ে যৌথ তদারকি ভিজিটসহ স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুব নেতৃত্বেও অ্যাডভোকেসি পরিচালনায় সুনাম অর্জন করেছে ইয়ুথনেট। তৈরি করেছে যুবদের জলবায়ু রুপকল্প। সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিশুদের করছে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন, তেমনি তারা ক্লিনিং ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে সুন্দর করে তুলছে দেশটাকে।

সুইডেনের কিশোরী গ্রেটা থুনবার্গ ২০১৯ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির বিরুদ্ধে বৈশি^ক জলবায়ু আন্দোলনের ডাক দিলে তাতে সংহতি জানিয়ে ইয়ুথনেট বাংলাদেশে প্রথম জলবায়ু ধর্মঘট আয়োজন করে। স্থাপন করে ফ্রাইডেস ফর ফিউচার বাংলাদেশ চ্যাপ্টার। বাংলাদেশের জলবায়ু আন্দোলনে পায় নতুন মাত্রা। বছরব্যাপি তরুণদের জলবায়ু আান্দোলনকে স্বীকৃতি দিয়ে জাতীয় সংসদ পাশ করে ‘গ্রহজনিত জরুরী অবস্থা’ বিল। পরবর্তী ১০টি কয়লা বিদ্যুত কেন্দ্র বন্ধ সহ সরকার মুজিব সমৃদ্ধি পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সর্বশেষ বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনেও (কপ২৬) বিশ্বমিডিয়ায় নজর কাড়ে ইয়ুথনেটের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমানের ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ। লাল সবুজের পতাকা নিয়ে পরনে পাঞ্জাবি-লুঙ্গি, গলায় গামছা আর দাবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড হাতে গ্লাসগোর তার প্রতিবাদের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এদিকে আর্ন্তজাতিক গণমাধ্যম ইউরো নিউজের এক সংবাদে গ্রেটা থুনবার্গেও পাশাপাশি বিশ্বের ৫ তরুণ জলবায়ু যোদ্ধার তালিকায় উঠে এসেছে সোহানুর রহমানের নাম ।

কাজের স্বীকৃতিসরূপ ইয়ুথনেট অর্জন করেছে বিভিন্ন দেশী ও বিদেশি সম্মাননা। জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড সংগঠনটির অন্যতম একটি বড় অর্জন। জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওর্য়াড প্রপ্তির ফলে ইয়ুথনেটের কাজের গতিশীলতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
জলবায়ু সুবিচার আদায় নিয়ে ইয়ুথনেটের কর্মকান্ড পরিচালনা করা একেবারেই সহজ ছিলোনা। নানা রকেমের প্রতিবন্ধকতা ও চড়াই উতরাই পেরিয়ে ইয়ুথনেট এতদূর এসেছে। তবে প্রতিনিয়ত এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হচ্ছে। জলবায়ু নিয়ে সাধারন মানুষের সচেতনার অভাব, প্রবীণদের মধ্যে তরুণদের অবমূল্যায়ন করার প্রবণতা এবং সবুজ উদ্যোগে অর্থায়ন নিশ্চিত করা ছিল প্রধানতম প্রতিবন্ধকতা। সচেতনার পর্যায় অনেক দূও অগ্রগতি হলেও অর্থায়ন নিয়েও এখনো হিমশিম খেতে হচ্ছে ইয়ুথনেটকে।

তবে ইয়ুথনেটের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান মনে করেন, জলবায়ু সংকটকে বাংলাদেশের ত দেশগুলোর মানুষের জীবন-মরণ সমস্যা। আমাদের হাতে একেবারেই সময় নেই। এ বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তরুণদের নেতৃত্ব, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে স্থানান্তর, প্রকৃতি ভিত্তিক সমাধান, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং স্থানীয় অভিযোজন তরান্বিত করতে বিশ^নেতাদের দ্রুত উদ্যোগী হতে হবে। কারণ দেরী মানে মৃত্যু। জলবায়ু সুবিচারের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে পরিবেশগত দূষণ থেকেও তরুণদের সুরক্ষা দিতে সরকারের প্রতি আর্জি তার।
একটি জলবায়ু সহনশীল এবং সমতার বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখায় ইয়ুথনেট। যেখানে তরুণ-যুবাদের কথা মূল্যায়ন করা হবে। ব্যাপকভাবে তরুণরা সম্পৃক্ত হবে জলবায়ু সুবিচার আদায়ের যুদ্ধে। নিজেদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের সুরক্ষায় বিশ্বনেতাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনবে তরুণরা।  তাদের অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায়। নিশ্চিত হবে একটি নিরাপদ পৃথিবী, সবার জন্য দূষণমুক্ত স্বাস্থ্যকর পরিবেশ!


error: Content is protected !!