মঙ্গলবার, ৪ঠা আগস্ট, ২০২০ ইং, ২০শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৪ই জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী
মঙ্গলবার, ৪ঠা আগস্ট, ২০২০ ইং

শরীয়তপুরের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাতের তদন্ত শুরু

শরীয়তপুরের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাতের তদন্ত শুরু

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আর্থিক খাতে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ওই দপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীরা লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন স্বাস্থ্য বিভাগের মহা পরিচালক বরাবরে। অভিযোগের তদন্ত করতে শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন ডা. আব্দুল্লাহ আল মুরাদকে প্রধান করে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শুরু করেছে সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি।

ভূক্তভোগীদের অভিযোগ থেকে জানা যায়, দীর্ঘদিন যাবত উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ে আর্থিক অনিয়ম ও দূর্নীতির মহোৎসব চলছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মেঘনাদ শাহ অফিস সহকারীদের মাধ্যমে দীর্ঘদিন যাবত পার্সেন্টিজ বাণিজ্য, ভূয়া বিল ভাউচার দাখিল করে সরকারী কোষাগারের লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করে আসছেন। তাঁর নামে কর্মকর্তা কর্মচারীদের প্রতিটি বিল থেকে ৩০-৪০ পার্সেন্ট টাকা রেখে দেন বলে অভিযোগ করেছেন ভূক্তভোগীরা। এই কর্মকর্তা ও তার দোষরদের পার্সেন্টিজ বাণিজ্যে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে স্বাস্থ্য সহকারী, নার্স, তৃতীয় চতুর্থ শ্রেনীর কর্মকর্তা কর্মচারীরা।

গেল জুন মাসে ভূয়া বিল ভাউচার তৈরি করে সরকারী কোষাগারের লক্ষ লক্ষ টাকা লোপাটে অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। জুন মাসে গ্যাস ও জ্বালানি ক্রয় বাবদ ২ লক্ষ ১২ হাজার ৩’শত ১০ টাকা একটি বিল এবং ১ লক্ষ ৪৮ হাজার ১’শত ২১ টাকা ভূয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীদের পোষাক ভাতা জনপ্রতি ১৫ হাজার ১’শত টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু পোষাক ভাতা বাবদ অফিস সহকারী রিশাদ জাহান প্রতি কর্মচারীকে প্রদান করেছে ১০ হাজার ৫শত টাকা। মৃত কর্মচারীর নামেও পোষাক ভাতার টাকা উত্তোলন করে আত্মসাত করেছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন অভিযোগকারী কর্মচারীরা।

পরিসংখ্যানের কম্পিউটার ও আনুসঙ্গিক বাবদ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে কিন্তু সেই বরাদ্দে টাকা উত্তোলন করে পরিসংখ্যান শাখাকে মাত্র ৪ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা বাবদ ৫ টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নামে ১ লক্ষ টাকা বিল উত্তোলন করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। কিন্তু বিলে উল্লেখিত উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলোকে একটাকাও দেয়া হয়নি। এভাবে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ করেছেন ভূক্তভোগীরা।

লাকার্তা উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার শিউলি বলেন, আমি দশ বছর যাবত এখানে কর্মরত রয়েছি। সাথে মহিষার উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের দায়িত্বেও রয়েছি। কিন্তু পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা বাবদ কোন টাকা পাইনি। আমার পকেটের টাকা দিয়ে প্রতি বছর পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম করে থাকি। আমি সিভিল সার্জন স্যারকেও পরিচ্ছন্নতার জন্য বরাদ্দের কথা বলেছি। স্যার বলেছেন উপজেলায় বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু কখনো এ বরাদ্দে টাকা আমরা পাই নাই।

কার্তিকপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উপসহকারী মেডিকেল অফিসার আব্দুস সাত্তার বলেন, আমি নিজের টাকায় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখি। এ যাবত কোন দিনই এ সংক্রান্ত কোন টাকা পাইনি। আমাদের নামে বরাদ্দ আছে তাও জানতাম না। এ জাতীয় অপরাধের কঠিন বিচার হওয়া উচিত।

পরিচ্ছন্নতা কর্মী রেশমা বলেন, আমাদের পোষাক ভাতার জন্য ১৫ হাজার টাকা করে বরাদ্দ এসেছে। কিন্তু প্রধান সহকারী ম্যাডাম আমাদের ১০ হাজার টাকা করে দিয়েছে। আমরা গরিব মানুষ। কম বেতনে ছোট চাকুরী করি। আমাদের পক্ষে কথা বলার কেউ নাই।

ড্রাইভার আবু তাহের বলেন, আমার পোষাক ভাতা বাবদ ১৯ হাজার টাকা বরাদ্দ এসেছে। কিন্তু আমাকে প্রথমে ১০ হাজার টাকা দিয়েছে। প্রতিবাদ করায় পরে আরো ৩ হাজার টাকা দিয়েছে। আমরা এ বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট অভিযোগ করেছি। কারণ কোন খাতে টাকাই আমরা সঠিকভাবে পাই না। অফিসে টাকা দিতে দিতে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে।

এমএলএসএস শাহিন বলেন, পোষাক ভাতা থেকে ৫ হাজার করে টাকা কম দিয়েছে। আমরা এর বিচার চাই। আমাদের টাকা এভাবেই বছরে পর বছর লূটে নিচ্ছে কিন্তু আমাদের বলারও জায়গা নাই। আমরা অসহায়। চাকুরীর ভয়ে কিছুই বলতে পারি না।

প্রধান সহকারী রিশাদ জাহান বলেন, আমি স্যারের নির্দেশে কাজ করে থাকি। আমার নামে এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। বরাদ্দ থেকে ভ্যাট কাটতে হয়। অনেক জায়গায় খরচও লাগে। এগুলো আসলেই বলা যায় না।

ভেরদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মেঘনাদ শাহা বলেন, টাকা পয়সার লেন-দেনের বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা। এগুলো প্রধান সহকারীর বিষয়।

শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন ডা. আব্দুল্লাহ আল মুরাদ জানান, এ ঘটনায় আমার নেতৃত্বে সিনিয়র মেডিকেল অফিসার আব্দুস সাত্তার ও সিনিয়র স্বাস্থ্য শিক্ষা কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমানের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ১০ টা থেকে আমরা তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছি। দু’ একদিনের মধ্যেই আমরা প্রতিবেদন দিতে পারবো।