বৃহস্পতিবার, ২২শে অক্টোবর, ২০২০ ইং, ৬ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৫ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী
বৃহস্পতিবার, ২২শে অক্টোবর, ২০২০ ইং

ভেদরগঞ্জে জমি সংক্রান্ত বিরোধে নির্যাতনে শিকার মুক্তিযোদ্ধা পরিবার

ভেদরগঞ্জে জমি সংক্রান্ত বিরোধে নির্যাতনে শিকার মুক্তিযোদ্ধা পরিবার

মধ্যযোগীয় নির্যাতনকেও হার মানিয়েছে ভেদরগঞ্জ এলাকায় প্রতিবেশীর মাধ্যমে এক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে নির্যাতন করার দৃশ্য। এই মুক্তিযোদ্ধার বাবার নামে বসত বাড়ির দলিল ও রেকর্ড থাকলেও প্রভাবশালী ওই প্রতিবেশীর দায়ের করা একের পর এক দন্ড বিধি, ফৌজদারী কার্যবিধি ও দেওয়ানী মামলার আসামী হয়ে নিজ বাড়ীর আঙ্গিনায় বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন ওই পরিবারটি।

দীর্ঘ দিনের জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে প্রতিবেশী শের আলী সরদার নামে এই ব্যক্তির দ্বারা শুধু মিথ্যা চাঁদাবাজীর মামলাই নয় শারিরিক ও মানষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে অসহায় জীবনযাপন করছেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল বেপারীর পরিবার। শের আলী সরদারের দায়ের করা প্রতিটি মামলা আদালত থেকে এই মুক্তিযোদ্ধার পক্ষে রায় দেওয়া সত্ত্বেও মালিকানা জমিতে ঘর তুলতে পারছে না মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল। এমনকি একটি গাছ লাগানো বা কাটতেও পারছেন না তিনি। বর্তমানে বসবাসের অযোগ্য একটি ঘরে স্ত্রী-সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন ওই মুক্তিযোদ্ধা পরিবার। এই নির্যাতনের বিষয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে তাদেরকেও মামলায় জড়ানোর হুমকি দিচ্ছে শের আলী। জনশ্রুতিও রয়েছে শের আলী সরদার সমাজ বিরোধী কার্যকলাপ ও অবৈধ ব্যবসার দায়ে একাধিকবার জেল জরিমানার শিকার হয়েছেন। এর পরেও তার নির্যাতন সহ্য করতে হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধার পরিবারসহ প্রতিবেশীদের।

কান্না জড়িত কন্ঠে সকল নির্যাতনের কথা এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিলের পরিবার ও প্রতিবেশীরা। তবে আব্দুল জলিল বেপারীর অভিযোগ মিথ্যা দাবী করে শের আলী তার পৈত্রিক জমি ফিরে পেতে একের পর এক মামলা করেছে বলে শিকার করেছে।
এ বিষয়ে ভেদরগঞ্জ থানার সদ্য যোগদান কৃত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন আমি এ বিষয়ে কিছুই জানিনা। আমি খোঁজ খবর নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাকে প্রয়োজনীয় আইনগত সহযোগীতা করবো।

মুক্তিযোদ্ধার পরিবার, স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও মামলার সূত্রে জানাগেছে, শরীয়তপুর জেলাধীন ভেদরগঞ্জ উপজেলার কোড়ালতলী গ্রামের মু্িক্তযোদ্ধা আব্দুল জলিল বেপারীর পিতা সিকিম আলী বেপারী। সিকিম আলী বেপারী একই এলাকার করিম বকস হাওলাদর ও রহিম বকস হাওলাদারের কাছ থেকে কোড়ালতলী মৌজার ৪২৩ নং দাগের ৪০ শতাংশ জমি থেকে ১৯৫৩ সালে সাব কবলা ১২৭ নং দলিল ও ১৯৫৫ সালের ৩৯১৫ নং দলিলের মাধ্যমে ২৭ শতাংশ জমির মালিক হয়। একই দাগের অপর ১৩ শতাংশ জমি আব্দুল মজিদ হাওলাদার এর কাছ থেকে ১৯৫৫ সালের একই দিন দলিল করে মালিক হয় শের আলী সরদারের পিতা তৈয়ব আলী সরদার। পরবর্তীতে এসএ রেকর্ডে সেই সম্পত্তি মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল বেপারী পিতা সিকিম আলী বেপারী ও শের আলী সরদারের পিতা তৈয়ব আলী বেপারীর নামে রেকর্ড হয়। রেকর্ডের মন্তব্যের কলামে ভুল বসত শের আলী সরদারের পিতার নামে সমুদয় ৪০ শতাংশ জমি দেখানো হয়। তার পরে কালক্রমে সেই জমি বাংলাদেশ সরকারের নামে চলে যায়। ১৯৮০ সালে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল বেপারীর পিতা সিকিমালী বেপারী ও শের আলী সরদারের পিতা তৈয়ব আলী সরদার সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসককে বিবাদী করে দেওয়ানী ৬৫ নং মামলা দায়ের করেন। ১৯৮৪ সালে সেই মামলায় আদালত সিকিমালী বেপারী ও তৈয়ব আলী সরদারের পক্ষে রায় ঘোষণা করেন। সেই থেকে দির্ঘ ২৮ বছর পরে তৈয়বালী সরদারের ছেলে শের আলী সরদার সিকিমালী বেপারীর পুত্র মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল বেপারীকে বিবাদী করে দেওয়নী ০৮/২০১৪ নং মামলা দায়ের করে সমুদয় জমি দাবি করে। সেই মামলার রায়ও মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল বেপারীর পক্ষে যায়। তারপর থেকেই শের আলী সরদার মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের প্রতি একাধিক দেওয়ানী, ফৌজদারী কার্যবিধির ১৪৪ ধারায় ও দন্ডবিধি আইনে চাঁদাবাজি মামলা দিয়ে হয়রানী করে আসছে। সেখানেই থেমে থাকেনি শের আলী সরদার, ভাড়াটে সন্ত্রাসী, নিজে ও তার সন্তানদের নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও তার পরিবারের উপর নির্যাতনও করেছেন একাধিকবার। এই বিষয়ে স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও থানা পুলিশ একাধিক শালিশ দরবার করে বিরোধ মিমাংসার সিদ্ধান্তে পৌঁছে। কিন্তু শের আলী সরদার শালিসদের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে পুনরায় মামলা মোকদ্দমায় জড়ায়।

বিরোধ মিমাংসার শালিস শাহ আলম হাওলাদার বলেন, মুক্তিযোদ্ধার প্রতিবেশী হাজী নুরুল ইসলাম হাওলাদার (৮০), নুরুল ইসলাম সরদার (৭৫), স্কুল শিক্ষক মোশারফ হোসেন (৫০) নামের ব্যক্তিরা বলেন, মুক্তিযোদ্ধার বসত বাড়ি সম্পর্কে আমাদের স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। এখানে তার বাড়ি-ঘর ও বাবা-মায়ের কবরও আছে। জমির কাগজপত্র ও মালিকানা সবই সঠিক। তবুও শের আলী নামে তার প্রতিবেশী একের পর এক মামরা করে হয়রানী করছে। আদালত কাগজপত্র দেখে জলিল বেপরীর নামে রায় দেয়। কারণ কাগজপত্র হলো জমির বাবা-মা। তবুও শের আলী সরদার এই নিরীহ পরিবারটিকে মামলা মোকদ্দমা দিয়ে, শারিরিক ও মানষিক ভাবে নির্যাতন করে আসছে। প্রতিবাদ করলেই শের আলী মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী করে। শের আলী একজন জুলুমবাজ, চরিত্রহীন, এবং তার হোটেল ব্যবসার মাধ্যমে নারী কেলেঙ্কারীর সাথে জড়িত রয়েছে। শের আলীর একের পর এক মিথ্যা মামলা করায় এবং হামলার ভয়ে মুক্তিযোদ্ধা জলিল বেপারী তার ভিটিতে ঘর তোলতে পারছে না।

মুক্তিযোদ্ধা জলিল বেপারীর ছেলে সালাউদ্দিন, আলাউদ্দিন ও মেয়ে নাজমা জানায়, বৃদ্ধ বয়সে তার পিতা-মাতা আর কত মার খাবে, দেশ ও জাতির কাছে তাদের প্রশ্ন। নির্যাতন সহ্য করার জন্যইকি তার বাবা জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করেছেন? অন্যায় জুলুমের কাছে কি তাহলে মুক্তিযোদ্ধার নীতি আদর্শ পরাজিত হবে?

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জলিল বেপারী বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছি। শত্রুবাহিনীদের পরাজিত করে দেশ স্বাধীন করেছি। কিন্তু নিজ ভুমিতে নিজেই পরাধীনের মত বসবাস করতে হচ্ছে। আমি কোথাও ন্যায় বিচার পাই না। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকার প্রধানের কাছে ন্যায় বিচার দাবী করছি।

শের আলী সরদার বলেন, আমাদের রেকর্ডীয় জমিতে মুক্তিযোদ্ধা জলিল বেপরী সাইবোর্ড লাগিয়ে দখল করছে তাই আমি মামলা করেছি। আমার নামেও জলিল বেপারী একাধিক মামলা করেছে। জলিল বেপারী যে মামলায় আদালত থেকে রায় পেয়েছে, সে রায়ের বিরুদ্ধে আমি আপিল করেছি।

এই বিষয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভুমি) শংকর চন্দ্র বৈদ্য বলেন, আমার কাছে মুক্তিযোদ্ধা আ. জলিল বেপারী একটা মৌখিক অভিযোগ করেছে। শুনেছি এই জমি নিয়ে আদালতে মামলাও রয়েছে।