বৃহস্পতিবার, ৪ঠা মার্চ, ২০২১ ইং, ১৯শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২০শে রজব, ১৪৪২ হিজরী
বৃহস্পতিবার, ৪ঠা মার্চ, ২০২১ ইং

জাজিরার ভ্যান চালক জুয়েল খলিফার সন্ধান দুই মাসেও মিলেনি

জাজিরার ভ্যান চালক জুয়েল খলিফার সন্ধান দুই মাসেও মিলেনি

নিখোঁজ হওয়ার প্রায় দুই মাস পেরুলেও পুলিশ সন্ধান দিতে পারেনি শরীয়তপুরের জাজিরার হতদরিদ্র ভ্যান চালক জুয়েল খলিফার। সন্তান সম্ভবা স্ত্রী রুপা বেগম স্বামীর খোঁজে এখন পাগলপ্রায়। বাবাকে না পেয়ে ৭ বছরের একমাত্র শিশুকন্যা জুঁই’রও সময় কাটে শুধু কান্না করে। পুলিশ বলছে জুয়েলের সন্ধান পেতে তারা যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে, জুয়েলের নিখোঁজের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য চলে এসেছে সংবাদ কর্মীদের কাছে।

শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার মুলনা ইউনিয়নের জয়সাগর গ্রামের মৃত সাফন আলী খলিফার ছেলে ভ্যান চালক জুয়েল খলিফা (৩০)। তিন ভাই পাঁচ বোনের মধ্য পঞ্চম জুয়েল খলিফা। তার বড় দুই ভাই সেলিম ও তুহিন দীর্ঘ দিন থেকে মালেশিয়া প্রবাসী। ভাড়ায় চালিত অটো ভ্যান চালিয়ে জীবীকা নির্বাহ করতো জুয়েল।

জুয়েলের পারিবারিক ও থানায় দায়েরকৃত সাধারণ ডায়েরী সূত্রে জানা গেছে, গত ১১ ডিসেম্বর, ২০২০ তারিখে বিকালে বাসা থেকে স্থানীয় লাউখোলা বাজারে যায় জুয়েল। রাত আনুমানিক ৮ টার সময় লাউখোলা বাজারের আবু আলম এর মুদি দোকান থেকে কিছু সওদা করে একই গ্রামের বাদশা মিয়াকে সাথে করে রিকশা ভ্যান যোগে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে ঢালী কান্দি ব্রিজের কাছে নামেন জুয়েল খলিফা। এরপর থেকে আর তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরদিন ১২ ডিসেম্বর, ২০২০ তারিখে অনেক খোঁজাখুজি করেও কোন সন্ধান না পাওয়ায় ১৩ ডিসেম্বর, ২০২০ তারিখে জুয়েল খলিফার স্ত্রী রুপা বেগম জাজিরা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। এর প্রেক্ষিতে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা মালমগীর হোসেন অনুসন্ধান শুরু করেন। জুয়েল খলিফা নিখোঁজ হওয়ার দিনে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কললিষ্ট চেক করে পুলিশ সন্দেহ ভাজন হিসেবে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য একই গ্রামের সোহেল ও রুবেল নামে দুই যুবক ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার কার্তিকপুর এলাকার একই পরিবারের মা মেয়েকে আটক করে। পরে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে স্থানীয় মুলনা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নুরুল আমিন হাওলাদারের জিম্মায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

এদিকে জুয়েল খলিফা নিখোঁজ হওয়া বিষয়ে সরেজমিনে অনুসন্ধানে গিয়ে মিলেছে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। জুয়েলের স্ত্রী রুপা বেগম জানান, নিখোঁজ হওয়ার ১৪/১৫ দিন আগে স্থানীয় খোকন হাওলাদার এর ছোট ছেলে রিশাদ হাওলাদার (১৮) এর কাছে সিমকার্ডসহ নিজের মোবাইল ফোন বন্ধক রেখে ৪০০ টাকা নেয় জুয়েল খলিফা। সেই মোবাইল নিয়ে রিশাদ প্রেমঘটিত সম্পর্কের দাবিতে পার্শ্ববর্তি বালিকান্দী গ্রামের বাসিন্দা মোবারক চৌকিদারের মেয়ে সুমাইয়ার (১৪) বাড়িতে যায় রিশাদ। এ নিয়ে ঐ বাড়িতে কিছুটা হট্টগোল হয়। রিশাদের ভাষ্যমতে, এ সময় জুয়েল খলিফার মোবাইল ফোনটি সুমাইয়াদের বাড়িতে ফেলে আসে রিশাদ। পরবর্তীতে জুয়েল খলিফা রিশাদের কাছে তার মোবাইল ফোন ফেরৎ চাইলে, দিতে না পারায় রিশাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি সিমকার্ডসহ নিয়ে যায় জুয়েল খলিফা এবং সেই সিমসহ মোবাইল ফোনটি ব্যবহার করতে থাকে সে। তার কয়েকদিনের মধ্যেই নিখোঁজ হয় জুয়েল খলিফা। এলাকার মানুষের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে, মোবাইল ফোন আদান প্রদান এবং সুমাইয়ার সাথে রিশাদের প্রেম কাহিনীই কি জুয়েল খলিফার নিখোঁজ হওয়ার কারণ হতে পারে?

অপরদিকে জুয়েলের স্ত্রী রুপা এবং চাচাতো ভাই শাহিন খলিফা জানান, জুয়েল খলিফা তাস খেলায় (জুঁয়া খেলায়) আসক্ত ছিল। নিখোঁজ হওয়ার আগের দিন জুয়েল প্রায় এক লক্ষ টাকা জুঁয়া খেলে জিতেছিল এমন একটি বিষয় এলাকায় রটে যাওয়ার কথা জানান শাহিন। এবং নিখোঁজ হওয়ার ৭দিন আগে এনজিও থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ তুলেন জুয়েল। জুয়েল নিখোঁজ হওয়ার পেছনে জুয়া খেলাও কোন ভূমিকা রাখতে পারে কি না সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে এলাকাবাসীর।

জুয়েল খলিফার স্ত্রী রুপা বেগম বলেন, আমার স্বামী শুক্রবার (১১ ডিসেম্বর) বিকেলে বাড়ি থেকে বাজারে যায়। তারপর আর কোন খোঁজ পাই নাই। দুই দিন অনেক খোঁজাখুঁজি করে কোন সন্ধান না পেয়ে থানায় জিডি করি। পুলিশও প্রথম দিকে কয়েক দিন খোঁজ করছে। প্রায় দুই মাস হয়ে গেল। আমার স্বামীর কোন খোঁজ কেউ দিতে পারলোনা। আমার সাত বছরের একটি মেয়ে জুঁই ক্লাশ টু’তে পড়ে । মেয়েটা সব সময় ওর বাবার জন্য কাঁদে। আমি বর্তমানে ৮ মাসের অন্তসত্বা। এ মাসেই আমার দ্বিতীয় সন্তান দুনিয়ায় আসবে। আমি সন্তানদের নিয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো। আমার স্বামীর কোন সম্পদ নেই। সামান্য একজন ভ্যান চালক ছিল আমার স্বামী। আপনারা আমার স্বামীকে দয়া করে খুঁজে আনুন।

তদন্তকারী কর্মকর্তা জাজিরা থানার উপ-পুলিশ পরিদর্শক মালমগীর হোসেন মুঠোফোনে বলেন, জুয়েল খলিফাকে খুঁজে বের করার জন্য পুলিশ যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। আমরা কয়েকজনকে সন্দেহের তালিকায় রেখেছি। মোবাইল ফোনের কললিষ্ট পরীক্ষা করার জন্য জেলা পুলিশ সুপারের মাধ্যমে ক্রাইম ড্যাটা রিপোর্ট (সিডিআর) এর জন্য পুলিশ সদর দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। সিডিআর এর অনুমোদন এখনো হাতে এসে পৌছেনি। অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরবর্তী তদন্ত কাজ করা হবে।

মূলনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নুরুল আমিন হাওলাদার বলেন, আমার এলাকার দরিদ্র ভ্যান চালক জুয়েল খলিফা অনেক দিন যাবৎ নিখোঁজ রয়েছে। পুলিশ সহ আমরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও জুয়েলের সন্ধানে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা জুয়েলের সন্ধানলাভে সকল চেষ্টা অব্যাহক রাখবো।