শুক্রবার, ১২ই আগস্ট, ২০২২ ইং, ২৮শে শ্রাবণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ১৪ই মুহাররম, ১৪৪৪ হিজরী
শুক্রবার, ১২ই আগস্ট, ২০২২ ইং

সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন, রাত পোহালেই মাহেন্দ্রক্ষণ, খুলছে স্বপ্নের দ্বার

সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন, রাত পোহালেই মাহেন্দ্রক্ষণ, খুলছে স্বপ্নের দ্বার

বহুল কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধনের মাহেন্দ্রক্ষণ কাল শনিবার। এ দিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই সেতুর উদ্বোধন ঘোষণা করবেন।

ইতিমধ্যে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। পদ্মা সেতু উদ্বোধনকে ঘিরে যে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে পুরো এলাকা।

বিপুল সংখ্যক সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবি ও পুলিশের একাধিক বিশেষ টিম নিরাপত্তার দায়িত্বে সদা নিয়োজিত রয়েছে। আশা করা হচ্ছে দশ লাখ লোকের সমাবেশ ঘটবে পদ্মা সেতু উদ্বোধন অনুষ্ঠানে।

পরের দিন ২৬ জুন থেকে ৯ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুতে জন সাধারণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। এর মধ্য দিয়ে অদম্য বাঙালি জাতির স্বপ্নের দ্বার খুলছে। এ সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে ঢাকাসহ সারা দেশের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন হতে যাচ্ছে। যাতায়াত ব্যবস্থায় নতুন মাইলফলকে পৌঁছে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

দেশি-বিদেশি নানা প্রতিকূলতা এবং প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে নিজস্ব অর্থায়নে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষমতা অর্জনের প্রমাণ মিলল। সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষ্যে সারা দেশে সাজসাজ রব উঠেছে। মাওয়া ও জাজিরা, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় আলোকসজ্জা করা হয়েছে।

সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই সেতুর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ঢাকাসহ সারা দেশে নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হতে যাচ্ছে। এর সরাসরি সুফল পাবেন তিন কোটির বেশি মানুষ। পরোক্ষ সুফল পাবে পুরো বাংলাদেশ। এ সেতুর সুবিধা নিয়ে মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর এবং ভোমরা স্থলবন্দরের ব্যবহার বেড়ে যাবে। কমবে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের ওপর আমদানি-রপ্তানি চাপ।

ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যাতায়াতের সময় অন্তত দুই থেকে চার ঘণ্টা কমে যাবে। ঢাকা থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত এক ঘণ্টায় যাতায়াত করা যাবে। এ সেতুর কারণে দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে। উন্মুক্ত হচ্ছে পর্যটনের নতুন দুয়ার।

এ সেতুর ফলে বছরে দশমিক ৮৪ শতাংশ দরিদ্রতা হ্রাস পাবে এবং জিডিপিতে এক দশমিক ২৩ শতাংশ অবদান রাখবে। শুধু তাই নয়, আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় এটি বড় ভূমিকা রাখবে। এশিয়ান হাইওয়েতে-১ (তামাবিল-সিলেট-ঢাকা-পদ্মা সেতু-যশোর-বেনাপোল) সরাসরি যুক্তের মাধ্যমও এ সেতুটি।

এর আগে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর ও নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০১ সালের ৪ জুলাই মাওয়ায় পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিস্তারিত সমীক্ষা, নকশা প্রণয়নসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষ করে ২০১১ সালের এপ্রিল থেকে জুন মাসে বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে ঋণ চুক্তি সই করে বাংলাদেশ।

কাজ শুরুর আগেই দুর্নীতির চেষ্টার অভিযোগে দাতা সংস্থাগুলো ঋণ চুক্তি বাতিল করলে ২০১২ সালের ৯ জুলাই এক বৈঠকে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকেই পদ্মা সেতুর বিভিন্ন কম্পোনেন্টের ঠিকাদার নিয়োগ শুরু হয়।

২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর মূল সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর এই সেতুর নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর গাড়ি চলাচলের জন্য খুলে দিতে কাল শনিবার নিজ হাতের তৈরি এই সেতুর উদ্বোধনও করবেন প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এদিন মাওয়া প্রান্তে সুধী সমাবেশের পর সেতু উদ্বোধন উপলক্ষ্যে স্মারক ডাকটিকিট ও স্যুভেনির শিটের উন্মোচন করবেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি টোল দিয়ে সেতু পার হয়ে জাজিরায় গিয়ে সেখানে আওয়ামী লীগের সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন। দুই পারেই সেতুর ফলক উন্মোচন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, সেতু নির্মাণকাজের ধাপে ধাপে নানা প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নির্মাণ করা হয় এ সেতু। সেতুর পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনে বিশ্বব্যাংক। অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, তৎকালীন সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া এবং সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তাদের গ্রেফতারের দাবি জানায়।

অভিযোগ তোলা হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে। এক পর্যায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়। সৈয়দ আবুল হোসেনকে মন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবুও দাতা সংস্থাগুলো এ সেতুর অর্থায়নে ফিরে আসেনি।

কানাডার আদালতে দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা মামলাও প্রমাণিত হয়নি। অবশেষে বিশ্বব্যাংক তাদের অর্থায়ন থেকে সরে আসা ভুল থাকার কথা স্বীকার করে। ওই অবস্থায় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে নিজ অর্থায়নে এ সেতুর বাস্তবায়ন করা হয়। এছাড়া বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস সংক্রমণ, ডলারের ও নির্মাণ যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধি, পদ্মা নদীতে ভাঙন ও তীব্র স্রোত এবং নদীর তলদেশে মাটির গভীরতায় নরম মাটির অস্তিত্ব পাওয়ার মতো কারিগরি ও বৈশ্বিক অনেক ধরনের প্রতিকূলতা পেরিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে পদ্মা সেতু।
#


error: Content is protected !!