
ছোট ছিমছাম গড়নের একটা মেয়ে বারবার চেম্বারের পর্দা উল্টিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছিল আর ফিসফিস করে অ্যাসিস্ট্যান্টের কাছে জানতে চাইছিল তার সিরিয়াল আসছে কিনা, কেমন দেরি, আর ক’টা রোগী? অ্যাসিস্ট্যান্ট সান্ত্বনা দিচ্ছিল প্লিজ বসুন, এই যে একটু পর, এইতো শেষ আরও একজন…এই তো শেষ আপু…।
অযথা তাড়াহুড়া পায়চারি করা মেয়েটি হয়তো জেনারেল এনজাইটির পেশেন্ট। চেম্বারে এসে যেসব রোগী খুব তাড়াহুড়া করেন তাদের বেশির ভাগই দেখা যায় তারা তাদের রোগ নিয়ে সামান্য এনজাইটিতে ভুগছেন। তাই তারা চেম্বারে এসে আর স্থির থাকতে পারেন না। পায়চারী করেন। উঠবোস করেন। এত দেরি…, এত দেরি… ডাক্তার সাহেব কই… ইত্যাদি বলে বলে অস্থির করে তুলেন সবাইকে।
যাক একসময় মেয়েটির সিরিয়াল এল। মা-সহ বসল আমার সামনে।
ছিপছাপ গড়নের চপল চঞ্চল ফর্সা মেয়ে। বয়সের তুলনায় শরীর বাড়ন্ত। এ বয়সী ছেলে মেয়েরা অনেকটা লাউগাছের ডগার মতো অনেকটা অজান্তেই হুট লম্বা হয়ে যায়। তার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘কী ব্যাপার! এত তাড়াহুড়ো কিসের?’
সাইকিয়াট্রিস্ট কে রোগীর ‘মুড অ্যান্ড এফেক্ট’ বুঝতে তাদের ফেইস রিড করতে হয়। কপালে ভাঁজ, চোখের দৃষ্টি, চোখের পাতার কাঁপন, ঠোটের কাঁপুন, চিউইং, গ্রাইমেসিং এসব। একেকটার একেক মিনিং হয়।
চেম্বারে বসেই কিছু স্কিজোফ্রেনিয়ার রোগী বারবার ঠোঁট নাড়াতে থাকেন, যেন মনে হয় তার দাঁতের কোনে কিছু একটা লেগে আছে, ওটা তিনি বের করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু পারছে না। একে গ্রাইমেসিং বলে। গ্রাইমেসিং দেখলে বোঝা যায় তিনি স্কিজোফ্রেনিয়ার পেশেন্ট।
কেবল সাইকিয়াট্রিস্ট নয়, সব চিকিৎসকদের রোগী পরীক্ষা শুরুর প্রথম ধাপ হচ্ছে প্রথমে একনজর তাকিয়ে রোগীটাকে দেখে নেয়া। এক্সামিনেশনের এ পর্যায়কে বলে ইন্সপেকশন।
চিকিৎসাবিদ্যার ছাত্রদের ক্লিনিক্যাল এক্সামগুলোর একটা বোর্ডে ভাইবা শুরুই হয় ইন্সপেকশন দিয়ে। স্যার এসেই বলেন, ‘ইন্সপেক্ট ইয়োর পেশেন্ট অ্যান্ড এক্সপ্লেইন’। পারলে স্যার আগাতে থাকে প্রশ্ন করেন। না পারলে ওখানেই ফেইল।
ইন্সপেকশন, পালপেসন, পারকাসন, অ্যান্ড আসকালটেসন। চেম্বারে হাসপাতালে রোগী পরীক্ষা করার ক্রম ধাপ। রোল অব থাম্ব। এটা চিকিৎসককে করতেই হয়। সেই অভ্যাস ছাত্রদেরকে আজীবন গেঁথে দিতেই পরীক্ষার হলে প্রতিটি পরিক্ষার্থীদের সব পরীক্ষায় পাস করার জন্যে এই ধাপগুলো ফলো করে করে এগুতে হয়। পরীক্ষক ও চিলের চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকেন এটি ফলো করা হচ্ছে কিনা!
পরীক্ষার আগে প্রফেসর, সি এ বা রেজিস্ট্রার দিয়ে সারা হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে বাছাই করে যে কোনো বেড থেকে আচমকা এক রোগীকে সিলেক্ট করে পরীক্ষার্থী বা পরীক্ষার্থিনীর সামনে এনে হাজির করেন। সেটা আবার নিজের মেডিকেলের পেশেন্ট হতে পারে অথবা হতে পারে চেম্বারের কোনো পেশেন্ট। হয়তো স্যার আগে রাতেই পেশেন্টেকে ম্যানেজ করে রাখেন। পরীক্ষা শুরুর জাস্ট আগে আগে ভর্তি করে বোর্ডে নিয়ে আসেন।
সবই স্যার দের প্ল্যান। অজানা অচেনা রোগীকে সামনে বসিয়ে পরীক্ষার্থী বা পরীক্ষার্থিনীকে ‘শুরু করো’, বলে মিনিট পাঁচেক সময় দেবেন। তারপর সব এক্সামিনার এক যোগে ছাত্রকে নিয়ে শুরু করবেন প্রশ্নের খেলা। প্রশ্নের পর প্রশ্ন। যতক্ষণ না ছাত্রটি আটকেছে, চলতেই থাকবে। এরই মধ্যে আমল নামায় লেখা হয়ে যায় ‘প’ আকার পাস নাকি আ-বা-র।
যাদের প্রিপারেশন ভালো, হাসপাতালের সব ওয়ার্ড চষে বেড়িয়ে রোগী দেখে, তারা ধুম ধাম চার ছক্কা পিটিয়ে খেলায় জিতে চলে যায়, আর যাদের প্রিপারেশন ‘নট আপ টু দা মার্ক’, স্যার রা হাসি মুখে ভাইভা বোর্ডেই তাদের কিছুটা পড়িয়ে দেন।
ভাইভাতে ধমক খেলে বুঝতে হবে পাস, আর হাসি মুখে বাপজান টাপজান বলে আদর সোহাগ করে টেবিলে রাখা বিস্কুট, পানি, চানাচুর ইত্যাদি অফার করে খাইয়ে দিলে বুঝে নিতে হবে, নট আপটু দা মার্ক। আমল খারাপ। তাদের কপালে, ‘ধন্যবাদ দেখা হবে বিজয়ে, তবে পরের বার’।
যাই হোক বলতে চাচ্ছিলাম ইন্সপেকশন এর কথা। কখনো কখনো ভালো ইন্সপেকশনেই রোগীর ডায়াগনোসিসে পৌঁছা যায়।
সাইকিয়াট্রিতে ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন ইন্সপেকশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফেইসে ‘মুড অ্যান্ড এফেক্ট’ দেখতে হয়। অনেক রোগ আছে যা চেহারায় ছাপ ফেলে। চেহারাতে অনেক রোগের লক্ষণগুলো সুন্দর ফুটে উঠে। বিশেষ করে ব্রেইন বা মানসিক রোগগুলোতে আছেই।
এই যেমন, একজন ম্যানিক নারী রোগীর দিকে তাকালে দেখা যাবে তিনি কটকটে কড়া লাল, নিল কিংবা হলুধ লিপস্টিক লাগিয়েছেন, সেই সঙ্গে থাকবে তার কুচকুচে কালো বা কড়া লালের ম্যাচিং ওর নন ম্যাচিং বেশভূষা মেকাপ, গেটআপ। বাহারি রংচং এর গয়নাও থাকবে সঙ্গে। কথাবার্তা হবে অনেক অনেক বেশি। গোছালো কিংবা অগোছালো, চিন্তা চেতনায় হাইপার।
আবার ডিপ্রেশনের পেশেন্টের থাকবে পুরো উলটো। এদের চেহারাটা থাকবে মলীন। কপালে থাকবে ভাঁজ। কথাবার্তায় একেবারে ঠাণ্ডা। যেন ইহজনমে তার কেউ নেই, তার জীবনটা একেবারেই সাদাকালো পানসে। সুইসাইড করলেই শান্তি।
আবার একজন পারকিনসন্স রোগীর ফেইস ধরা যাক। উনাকে দেখলে বোঝা যাবে না যে, উনি ঠিক কি বলতে চাইছেন বা বোঝাতে চাইছেন। সেটাকে মেডিকেলের ভাষায় বলে ‘এক্সপ্রেশন লেস ফেইস’। মানে এক্সপ্রেশনটি কি, তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
ভালো মানের একজন বিশেষজ্ঞ আপনার ফেস এক্সপ্রেশন দেখে অনেক কিছুই বলে দিতে পারেন। তবে সেটা ‘বাবার দরবারে শেষ দর্শন’ বা রাস্তায় কঞ্চিতে চড়া টিয়া পাখির’ ‘ঠোটের বয়ানের’ মতো মতো হাবিজাবি ফালতু না, বিজ্ঞানসম্মত যা চিকিৎসাবিদ্যার বইয়ের পাতায় খুব সুন্দর করে লেখা। সেই লেখাগুলো বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণায় লব্দ জ্ঞান থেকে নেয়া।
ছিপছিপে হালকা গড়নের লাউ ডগার মতো বাড়ন্ত শারীরিক গঠনের ছোট মেয়েটির মুখাবয়ব বড় যে গলদ ধরা পড়লো সেটা হলো তার কপালে একটি চিকনপোড়া দাগ। সদ্য পোড়া। কালো পোড়া রক্তের চটা লেপ্টে আছে এখনও।
জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার, পোড়া দাগ কিসের?
‘গরম সুই দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে পীর বাবায়’! জবাব দিল সে।
‘মানে?’
‘স্যার আমি বলছি’ বলেই মেয়ের মা বলতে লাগলেন, গত বছর তিনেক থেকেই আলগা এক রোগে পেয়েছে মেয়েটিকে। হলেই সে অজ্ঞান হয়ে যায়। তার শ্বাস কষ্ট হয়। দম আটকে যায়। হাতে পায়ে খিঁচুনি হতে থাকে অবিরত। বুকে বান বান লাগে। বিড় বিড় করে কথা বলতে থাকে। এনিয়ে ক’বছর থেকে বারবার হাসপাতালে ভর্তি হই। প্রতিবার স্যালাইন ইঞ্জেকশন আর অক্সিজেন দেয়া হয়। ভালো হয়ে যায়’।
‘আবার কদিন যেতে না যেতে সেই আগের মতো। আজ সকালে ও তাই হয়েছে। বিরক্ত হয়ে আজ আর হাসপাতালে যাইনি। গিয়েছিলাম এক পীরের কাছে’
“শুনলাম আমাদের শঙ্খঘর গ্রামে এক পীর আছেন, তিনি নাকি ‘উপরী’ তাড়ান। তার কাছেই গিয়েছিলাম। দুটা জালালী কৈত্র, তিনটে কালো মুরগি, একটি কাক, এক কেজি পোলাউয়ের চাল আর এক দানা মশুরির ডাল নিয়ে”।
জালালি কৈতর খুব দাম। দুই হাজার টাকা জোড়া।
‘আজব, এত জিনিস সঙ্গে এক দানা মসুরি ডাল’, একদানা ডালে কী হবে? উনি কি ডাল চিবিয়ে খাইয়ে দেন’?
‘জ্বি এগুলো বাবার উপরি তাড়ানোর হাদিয়া’
‘তা না হয় বুঝলাম, এগুলো বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জের কিছু টাউট বাটপার আর তাদের সঙ্গে থাকা রুই কাতলা টাইপের কিছু সাঙ্গপাঙ্গদের নাটক আর প্রতারণা কিন্তু কপালে পোড়া দাগ কিসের?’
‘জ্বি বলছি, বাবায় একটা সুই দিলেন। পানি পড়া দিলেন। আর তার মুখের লালাপড়া দিলেন’
‘লালাপড়া?’
“হ্যা। লালাপড়া। ‘উপরি বাতাস’ কাটার মন্ত্র জপে তার মুখের লালা মেয়েটির সারা গায়ে নিজ হাতে মেখে দিলেন…! তার পর বললেন, যাহ বাড়ি যা…। উপরি আর লাগবে না, লালাপড়া দিলাম তুকে। আমি আবার যাকেতাকে লালাপড়া দেই না। তোর গায়ে সন্ধ্যা বেলার ত্রিমুখী রাস্তার “উপরি” লাগছিল। তার ঘ্রান পাইছি, তাই লালাপড়া দিলাম। উপরি এখন ভাগছে আর আসবে না। যাহ বাড়ি যাহ…।”
এরপর আমাকে বললেন, ‘খবরদার ভর দুপুর, সন্ধ্যা আর অমাবস্যায় এই জোয়ান মেয়েডা যেনো আর ত্রিমুখীতে রাস্তায় না যায়। যাইলে কিন্তু বড় ক্ষতি হইয়া যাইব। আবার উপরি লাগব। পুরুষ উপরি । উপরির মধ্যে কিন্ত দুই জাত। মেয়ে উপরি আর পুরুষ উপরি’।
‘ত্রিমুখী রাস্তার উপরিগুলো আবার ‘বজ্জাত উপরি”। সেই গুলানরে তাড়াতে খুব কষ্ট। বুঝছস। লাগলে খবর আছে। অমাবস্যাতে একলা ঘরে সারা রাইত ধইরা মন্ত্র জপতে অইবো আর লালাপড়া দিতে অইবো…”, এক নিঃশ্বাসে মেয়েটির মা ‘বাবার’ বলা কথাগুলো বললেন। তার বলার ভঙ্গিতে বুঝলাম তিনি উপরিতে খুব বিশ্বাস করেন।
আচ্ছা তারপর কি হলো…?
‘তারপর পীরের কাছ থেকে এক হাজার টাকা হাদিয়া দিয়া একটা সুঁই নিয়া বাসায় আসি। বাসায় আসার পর মেয়েটি আবার অজ্ঞান হয়। তখন মনে পড়ে, পীর বাবায় কইছিল, ‘বড় উপরি পলাইয়া গেছেগা তয় তার ছাওয়াল-পাওয়ালগুলো একটু-আধটু লাইগা থাকতে পারে। ডিস্টার্ব করব। যাইব-গা কদিন পর। আর বেশি ডিস্টার্ব করলে তোরা এই সুইডারে গরম কইরা টকটকে লাল কইরা তারপর দিবি কপালের চামড়ায় ভেতর ঢুকিয়ে..’।
বাড়িতে ফিরার পর মেয়েটি আবার অজ্ঞান হলে ‘বাবার’ কথামতো আমরা প্রথমে ওর হাত পা বেঁধে নেই এবং সুইটা আগুনে পুড়িয়ে লাল করে নিয়ে ‘সুই-পোড়া’ দেই’, এই দাগটা স্যার সেই সুই দিয়ে পোড়ার ..!!!
এবার মেয়েটি ক্ষেপে গিয়ে মুখ খুলল, ‘দেখছেন, দেখছেন পাগলদের কাণ্ড। আমারে কি করছে এরা সবাই মিলে। আমার কপালটা পুড়িয়ে দিছে। আমার নাকি উপরি বাতাস লাগছে। ওরা আমাকে বেঁধে গরম সুই দিয়ে কপাল জ্বালিয়ে দিসে। আর এটা করছে আমার দুলাভাই আর মা’য় মিলে..’। স্যার দেখেন দেখেন বলে, মেয়েটি তার দগদগে পোড়া দাগটি আবার দেখালো।
সত্যি, বিবৎস। সাদা কপাল একেবারে পুড়িয়ে দিয়েছে তারা উপরি তাড়ানোর নামে ভণ্ড বাবার কথামতো। আমাদের দেশের গ্রামগঞ্জে এখনো মানসিক রোগীদের রোগ তাড়াতে এসব গাঁজাখোরি চিকিৎসা পদ্ধতি দেখা যায়। সমাজের একশ্রেণির টাউট-বাটপার এতে জড়িত থাকে। এদের আবার উপরমহলে থাকে অদৃশ্য যোগাযোগ। সবাই এসব হাদিয়ার ভাগবাটোয়ারা পায়,মজাও লুটে এসব থেকে। যাক, মা এবার ধমক দেন মেয়ে কে, ‘এই বেয়াদব, চুপ কর, চিৎকার করবি না’, চিৎকার করলে আবার সুই পুড়া আবার দিমু…’
আমি বললাম, একটু থামুন। ওকে বলতে দিন…।
‘বল কী হয়েছে তারপর’,।
সে আবার শুরু করল, ‘স্যার এরা উপরি বিশ্বাস করে। আর ওই যে ভণ্ড পীরবাবা, ওটা তো একটা শয়তান। পীরবাবা-টিরবাবা না। সারা গায়ে দুর্গন্ধ, ময়লা। লম্বা লম্বা নোখ, আর পুরা ন্যাংটা। এই শয়তান আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা আমার সারা গায়ে লালা মাখায়ে দিছে, ওয়াক থু…। আল্লাহ গো আমারে বাঁচাও। আমারে নাপাক করে দিসে বদমাশটা। আর সব করছে মা আর দুলাভাই।
মা এবার মেয়েটির মুখ চেপে ধরে। ‘খবরদার তুই বাবার রে গালি দিস কেন? গুনাহ হবে…! মেয়েটি কে থামাতে চান তিনি।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বাবা কই?
‘স্যার, বাবা বিদেশে। বাবা থাকলে কি এই পাগলা বাবার পাগলা মুরিদগুলো আমারে এই সর্বনাশ করতে পারত, আব্বু সব বদমাশগুলোরে ধইরা পানিতে চুবাই তো’
তোমার ভাই চাচা বা মামা কেউ নেই? মানে পুরুষ অভিভাবক।
“জ্বী স্যার, সবাই আছেন, কিন্তু মা উনাদের না জানায়া দুলাভাইয়ের সঙ্গে সলাপরামর্শ কইরা লুকাইয়া আমারে নিছে ভণ্ড বাবার কাছে…’, মেয়েটি আর কিছু বলল না। তার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল।
তার মাকে জিজ্ঞেস করলাম, ওই ভণ্ডটার সন্ধান কীভাবে পেলেন আপনারা?
“স্যার উনি ভণ্ড না। উনার অনেক কেরামতি আছে। উনি আমাদের গায়ের অনেক নিঃসন্তান মাইয়ার কোলে সন্তান দিসে কেরামতি কইরা। আমার বড় মেয়ের জামাই ওই ‘বাবার’ মুরিদ। সেই বলছে সব। বাবায় নাকি সুই পুড়া দেন গত ১০ বছর ধরে। তাছাড়া জামাইয়ের একটা আংটি পাথরের দোকান আছে শহরে। পীর বাবায় আংটি পরার হুকুম দিলে সবাই জামাইর দোকান থেকে কিনে। কিছু কিছু আংটির দাম লাখ লাখ টাকা”
‘তা আমার কাছে এখন আসছেন কেন? ‘
‘স্যার সুই পোড়া দেয়ার পর তার কপাল থেকে রক্ত পড়তে থাকে চুইয়া চুইয়া। কালো কালরক্ত। রক্ত পড়া বন্ধ না হওয়ায় হাসপাতালে যাই। ওইখানের বড় ডাক্তার এসব দেখেশুনে আমাদের খুব গালিগালাজ করে। বলে তোমাদের পুলিশে দেয়া উচিত। পরে বলেন, ‘মানসিক ডাক্তারের কাছে জলদি যান। মেয়েটিকে মেরে ফেলবেন তো আপনারা এই সব ছাইপাঁশ ভণ্ড পীর, ফকির দিয়ে চিকিৎসা দিয়ে’। তাই আসলাম…’
ছোট মেয়েটি আর কোনো কথা বলছিল না। তার গাল বেয়ে অশ্রু পড়ছিল। বোবা কান্নায় ঠোঁটটা কাঁপছিল। বোঝা যাচ্ছে সে খুব দুঃখ পেয়েছে। অপমানিত ও
ও লাঞ্ছিত হয়েছে এসবে।
তুমি কি সত্যি অজ্ঞান হয়ে যাও? হাত-পা ছোড়াছুড়ি কর? জিজ্ঞেস করলাম।
‘জ্বি স্যার’, সে মাথা নাড়ে।
অজ্ঞান হওয়ার আগে তুমি কি বুঝতে পারো যে তুমি অজ্ঞান হতে যাচ্ছ?
না স্যার, বুঝি না।
আমরা বুঝি স্যার, পাশে বসা মা বললেন।
‘আপনি কীভাবে বুঝেন?’ জিজ্ঞেস করলাম
‘এই তো স্যার, কোনো ব্যাপার নিয়ে ধমকালে, শাসন করলেই তার খিঁচুনি শুরু হয়, লম্বা লম্বা করে দম নিতে থাকে, পরে কিছুক্ষণ দম বন্ধ হয়ে থাকে। হাত পা ছুড়তে ছুড়তে এক সময় অজ্ঞান হয়ে নিস্তেজ হয়ে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যায় আর জ্ঞ্যান আসে না…’
ওহ তাই…?
অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে, বা জিহ্বা কেটেছে কখনও?
‘না না স্যার এইতো বিছানায় পড়ে যায়। আমরা ধরাধরি করে শুইয়ে দেই’
‘আচ্ছা অজ্ঞান হলে তুমি কিছু বুঝ, এই যেমন আশপাশে কি হচ্ছে, কি করছে?’ মেয়েকে বললাম।
‘জ্বি স্যার সব বুঝি?’
তাই…?
আমি মেয়েটির মাকে বাইরে অপেক্ষা করতে বললাম। তিনি ইতস্তত করে গেলেন।
“শোন,আমার মনে হচ্ছে তোমার সমস্যা অন্য কিছুতে। তোমার সমস্যাটা মানসিক। সম্ভবত তোমার মনের কোনে কোথাও কোন কষ্ট বা ব্যথা লুকিয়ে আছে যা তুমি সহ্য করতে পারছ না, আবার কাউকে বলতেও পারছ না”,। এসব কষ্ট, সমস্যা তুমি নিতে পারছ না। যাক, তুমি কিসে পড়?
স্যার সেভেনে?
পড়াশোনা ভালো লাগে?
জ্বী?
‘শিক্ষক দের কেউ কি আছেন খুব শাসন করেন বা আদর করেন’
‘না স্যার’
‘ভাই, বোন কেউ আছেন অত্যধিক শাসন করেন বা আদর করেন?’
‘না’। সে মাথা নেড়ে বলে।
মেয়েটির মা হুট করে আবার ঢুকে পড়লেন। আমি তাকে বললাম, “প্লিজ বাইরে বসুন, আমি ওর সঙ্গে কথা বলতে চাই একাকী..,পরে আপনার সঙ্গেও বলব…’
মা বললেন, ‘স্যার আমি জানি আপনি কি বলবেন। আমি থাকি, অসুবিধা নেই’
‘না। আপনি একটু বাইরে বসুন’
“যাও মা, তুমি বাইরে যাও,তুমিই সব কিছুর মূলে…”। মেয়ে এবার একটু শক্ত করেই বলল মাকে।
আমি চেম্বার এসিস্ট সিস্টার কে একটু দূরে বসতে বললাম, যাতে মেয়েটি মন খুলে বলতে পারে।
‘বল, কি সমস্যা তোমার?’
‘স্যার তেমন কোনো সমস্যা নেই। তবে ছোট একটা আছে’
‘নাম কি তোমার?’
‘পপি’
‘পপি তুমি কাউকে ভালোবাস?’
সে উত্তর দেয়না। মাথা নিচু করে বসে রয়। অনেক সময় নিরুত্তর-ই উত্তর বহন করে।
‘কাকে ভালোবাস?’ আমি সরাসরি বললাম।
‘ন্যা স্যার কাউকে না’
‘আড়াল কর না। তোমার মতো ৮-১০ জন পেশেন্ট প্রতিদিন আমাদের দেখতে হয়। বল আমি সাহায্য করবো তোমাকে। কেউ কিছু জানবে না’
মেয়েটি একটু চুপ থেকে বলল,
‘হ্যা ভালোবাসি’
‘কাকে?’
‘একজন কে’
‘কে সেই একজন?’
‘দুঃসম্পর্কিত আত্মীয়’
‘কতদিন থেকে?’
‘তিন বছর যাবৎ’
‘এতো অল্প বয়সে ভালোবাসাবাসি? সত্যি?’
‘স্যার কাউকে বলবেন না তো?’
‘না, বললাম তো বলব না। তুমি নিশ্চিন্ত থাক। কেউ কিছু জানবে না’
‘জ্বি স্যার, আমি একজন কে ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি। তাকে ছাড়া আমি বাঁচব না, আত্মীয় বলেছিলাম, আসলে আত্মীয় না’
‘তাই?’
‘জ্বী’
‘কিন্তু তোমার যে বয়স, তাও আবার তিন বছর যাবৎ। এত অল্প বয়সে…!! কি করে ছেলেটা?’
‘ছেলে না। উনার বয়স আছে। বাজারে উনার মোবাইলের দোকান আছে, ব্যবসা আছে..’
‘কীভাবে পরিচয়?’
‘উনার মোবাইলে আব্বু বিদেশ থেকে টাকা পাঠান নিয়মিত। উনি দিয়ে যান। তাছাড়া উনি আমাদের পরিবারের সদস্যের মতো। সব সময় আমাদের বাসায় আসেন, থাকেন ও। খুব ভালো মানুষ। আমাদের বাজার সদাই সব উনি করে দেন…’
‘তোমার মা এসব ভালোবাসা জানেন?’
‘না’
‘কেমন গভীর তোমার ভালোবাসা?’
সে উত্তর দেয় না
লোকটির বয়স কত?
এই ৩০, ৩২।
:কিন্তু তোমার তো বয়স খুবই কম। এত সম্ভব না। তোমার পড়াশোনাও বাকি। তোমার একটা ভবিষ্যৎ ও আছে..’
‘জ্বি স্যার। এগুলো ভাবলেই আমার মাথা ঝিনঝিন করে। আমি যে কি করবো বুঝতে পারি না.,তখন অজ্ঞান হয়ে যাই’
‘তুমি এই কথাগুলো কাউকে বলেছ?’
‘না স্যার। মাকে বলতে চেয়েছি। কিন্তু লজ্জায় বলিনি। এই প্রথম আপনাকে বললাম.. আপনি মাকে বইলেন না এসব’, সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
‘না, না আমি বলব না’
‘ভয়ের কিছু নেই। অল্প বয়সে টুকটাক এসব ভুল কেউ কেউ করে বসে। দোষ আসলে আমাদের অভিভাবকদের। আমাদের সচেতন থাকা দরকার এসবে। অনেকে তো অজান্তে কাজি অফিস বা কোর্ট পর্যন্ত চলে যায়। তুমি তো এসব কিছুই কর নি। কিন্তু তোমার এসবের সময় এখন না। তোমার তো এখন পড়ালেখার সময়, তাইনা…?’
‘জ্বী স্যার’ সে মাথা নাড়ায়।
‘শোন তুমি তোমার মাকে খুলে বল সব। হাজার হোক তিনি তোমার মা। তিনি হয়তো প্রথমে একটু রাগ করবেন। কিন্তু এই ঝামেলা থেকে তিনি বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবেন। আমি কি তোমার মাকে একটু ইঙ্গিত দেব?
‘না স্যার। আপনি যখন বলছেন, আমি মাকে সব বলব। আসলে আমি অনেক দিন থেকে বলতে চাইছি। কিন্তু লজ্জা আর ভয়ে বলছি না মাকে। তবে মা’র ও একটু সমস্যা আছে উনাকে নিয়ে..’
কি সমস্যা…?
‘পরে একদিন বলব স্যার’
‘আচ্ছা স্যার কেউ কেউ বলে আমার নাকি হিস্টিরিয়া বা মৃগী রোগ হয়েছে। আবার বলে উপরি রোগ। আসলে কি তাই? উপরি-টুপরি বলে তো কোনো রোগ নেই। আর এসব বাবারা তো ভণ্ড,শয়তান’
‘হ্যা,পলি এসব জানি। আসলে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে। কুসংস্কার এখনও আমাদের চারপাশে লেগে আছে। তুমি তো ভিকটিম, এসব ভালো বুঝতেছ। আর সাধারণ মানুষ ধর্ম, বিজ্ঞান জানে না বলেই এসব বিশ্বাস করে, এবং ঠকে’
‘তাহলে স্যার, আমার কেনো এমন হয় মাঝেমধ্যে?’
‘তুমি তোমার সমস্যা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছ। কী করবে, বা না করবে এসব বুঝে উঠতে পারছ না। এ রোগটির নাম কনভার্সন ডিসঅর্ডার। তোমার অসম ভালোবাসা, তোমার মা’কে নিয়ে সমস্যা, পারিপার্শ্বিক জঠিলতা, এসব তোমার মনের মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে যা থেকে তুমি বেরোতে পারছ না’।
‘এসব তুমি কাউকে বলতে পারছ না, আবার এর থেকে বেরোতেও পারছ না। ভালোমন্দ, নিশ্চিত অনিশ্চিত এর সঙ্গে সারাক্ষণ তোমার মন ঝগড়া করছে’
“আর এই সমস্যাগুলো যখন প্রকট হয় তখন তার লক্ষণ তোমার দৈহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এটাই ‘কনভার্সন ডিসওর্ডার’। আর যত দিন তোমার এসব সমস্যা তুমি কাউকে শেয়ার করছ না, কাউকে বলছ না, বা সঠিক পথের সন্ধান পাচ্ছ না, তত দিন তোমার এসব সিমটম থাকবে।”
‘স্যার তাহলে আমি কী ভালো হব না?’
‘অবশ্যই ভালো হবে, তুমি তোমার সমস্যা’
লেখক: ডা. মো. সাঈদ এনাম, এমবিবিএস (ডি.এম.সি) এম ফিল (সাইকিয়াট্রি) সাইকিয়াট্রিস্ট, উপজেলা স্বাস্থ্য প প কর্মকর্তা, সিলেট।