মঙ্গলবার, ২৪শে নভেম্বর, ২০২০ ইং, ৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৯ই রবিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী
মঙ্গলবার, ২৪শে নভেম্বর, ২০২০ ইং

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা অবিনশ্বর : শহীদুল ইসলাম পাইলট

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা অবিনশ্বর : শহীদুল ইসলাম পাইলট

॥ শহীদুল ইসলাম পাইলট ॥

জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনী রাষ্ট্র ও সরকারের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। এক সাদামাটাভাবে দেখার কোন সুযোগ নেই। পুলিশ বাহিনী আছে বলেই আমরা নিরাপদে আছি। আমাদের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য তারা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। সরকারের সকল বিভাগ নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে থাকেন। কিন্তু পুলিশের দায়িত্ব বিরতিহীন। অবিরাম নিরলসভাবে তারা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে থেকে, ঝুঁকি নিয়ে তাদের অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে হয়। যা সরকারের অন্য কোন বিভাগে নেই বললেই চলে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সচরাচর তাদের নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এর ফলে অনেক সময় তাদের জীবন বিপন্ন হয়। কখনোবা আঘাত পেতে হয়, পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়। পুলিশের বিপদ পায়ে পায়ে। তাদের সর্বদা অমানবিক, অসামাজিক, অপরাধ, সন্ত্রাস, চাদাবাজী, মাদক, খুন-খারাপি, ধর্ষণ ইত্যাদি নানা অপকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষ নামের অমানুষদের প্রতিহিত করতে হয়। উল্লেখিত অপকর্ম এবং এর সঙ্গে সংযুক্তদের মোকাবেলা করা আমরা স্বাভাবিকভাবে যত সহজ ভাবি আসলে ব্যাপারটা তত সহজ নয়। কাজটি অত্যন্ত জটিল ও কঠিন। তবে কাজ যত জটিল বা কঠিনই হোক না কেন, তার মোকাবেলা পুলিশকে সুন্দরভাবে করতে হয়। পুলিশ সুন্দর ভাবেই তা করে যাচ্ছেন।

সভ্যতার প্রথম ভোর থেকে অদ্যাবধি পুলিশ বাহিনী রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে, দেশে-দেশে, অঞ্চলে-অঞ্চলে নানা সময়ে নানা নামে জননিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ দায়িত্ব তারা সফল ভাবেই পালন করে যাচ্ছেন। পুলিশ বাহিনীর সফলতার হাজার হাজার নজীর গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে রয়েছে। সফলতার পাশাপাশি ব্যর্থতাও আছে। তবে এ ব্যর্থতার হিসেব খুব ছোট। ক্ষেত্র বিশেষ ব্যর্থতা সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানেই রয়েছে।

বাংলাদেশ নামীয় রাষ্ট্র সৃষ্টির সাথে সাথেই পুলিশ বাহিনী গড়ে উঠেছে। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা অবিনশ্বর। পুলিশ বাহিনীর ত্যাগ অমলিন। মহান স্বাধীনতার সূচনা লগ্নে ২৫ মার্চ কালো রাত্রিতে হানাদার বাহিনী প্রথমেই আক্রমন চালায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনে। এ সময় পুলিশও বসে থাকেনি। তারা পাল্টা হামলা চালিয়ে প্রতিরোধ করেছে নরপিশাচ পাক হানাদারদের। মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পুলিশ বাহিনী দেশ মাতৃকার স্বাধীনতা স্বার্বভৌমত্বের জন্য জীবনের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে যুদ্ধ করেছে। যুদ্ধে অনেক পুলিশ সদস্য শাহাদাত বরণ করেছেন। অনেকে হাত হারিয়েছেন, কেউবা পা হারিয়েছেন, আবার কেউবা সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করে নিয়েছেন। এদের অনেকে এখনো আছেন। যারা ভাগ্যক্রমে অক্ষত ছিলেন, তারা অনেকেই আছেন আমাদের মাঝে। এদেরকে দেখে স্যালুট করতে মন চায়।

শুধু মহান স্বাধীনতা যুদ্ধই নয়। দেশ ও জাতির দুর্দিন-দুঃসময়ে, অভাবে-অভিযোগে, খরা-বন্যায়, ঝড়-তুফানে, গ্রীষ্ম-বর্ষায়, দিনে-রাতে, সময়ে-অসময়ে পুলিশ বাহিনী আমাদের ছায়া দিয়ে, মায়া দিয়ে, সেবা দিয়ে, যত্ন দিয়ে, কাছে থেকে, পাশে থেকে আপনার চেয়ে আপন হয়ে আছেন এবং থাকবেন। পুলিশের সেবা অপরিসীম। তাদের সেবার পরিধী বিশাল। এ বিশাল ও বিস্তৃত সেবা প্রদানে যথেষ্ট ঝুঁকি ও জটিলতা রয়েছে, যা মোকাবেলা করে অনেক সময় শতভাগ সফলতার মুখ দেখা নাও যেতে পারে বা ক্ষেত্র বিশেষ বত্যয়ও ঘটতে পারে। তবে সফলতার অংক অনেক বড়। মাঝে মধ্যে পুলিশের কিছু ব্যর্থতা বা নেগেটিভ সংবাদ শোনা যায়। যা তাদের বিশাল সফলতার উপর আঘাত হানে। আর আমরা তাদের সকল অবদান ও সফলতার কথা ভুলে গিয়ে হই হই করে উঠি। আমাদের বুঝতে তবে তারাও মানুষ। ভুল মানুষেরই হয়। একশ শুদ্ধ একটি ভুলের কাছে হেরে যেতে পারে না। অনেক সুন্দর সামান্য কালিমায় মলিন হয়ে যেতে পারে না। আমাদের উচিৎ পুলিশের সফলতা ও ব্যর্থতার হিসেব কষা। এতে করে দু’একটি ব্যর্থতায় হই হই করে উঠতে বিবেকে বাঁধা দেবে। কারণ ক্ষেত্র বিশেষ ব্যর্থ বা বিতর্কিত পুলিশ বাহিনীর বিশাল অবদান ও হাজার হাজার সফল কাহিনী রয়েছে। তেমন একটি নজিরবিহীন সফল কাহিনীর বর্ণনা দেয়ার জন্য কলম ধরেছি। শরীয়তপুরের মাটি ও মানুষের মুখপত্র ‘দৈনিক রুদ্রবার্তা’ পত্রিকা শরীয়তপুর জেলা পুলিশের সফলতার গল্প প্রকাশ না করলে আর করবে কে? তাই পাঠকদের জন্য সদ্য ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে জেলা পুলিশের নজরবিহীন সফলতা তুলে ধরছি। অতি সম্প্রতি ‘দৈনিক রুদ্রবার্তা’ সহ অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমে শরীয়তপুর শহরের পালং উত্তর বাজার সেমন্ত ঘোষ মডার্ণ স্মার্ট গ্যালারী নামীয় দোকান থেকে রাতের আঁধারে আন্ত:জেলা মোবাইল চোর চক্রের সদস্যরা ১৬২ টি মোবাইল সেট, যার আনুমানিক মূল্য ২৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা চুরি করে পালিয়ে যান। ঐ ঘটনায় সেমন্ত ঘোষ পালং মডেল থানায় বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলায় শরীয়তপুর পুলিশ সুপার এস এম আশ্রাফুজ্জামান এর নির্দেশে নড়িয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম মিজানুর রহমান ও জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি সাইফুল আলমসহ পুলিশের একটি প্রতিনিধি দল ৩০ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর অভিযান চালিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মোবাইল সেটগুলো উদ্ধার করেন এবং ৭ জনকে গ্রেফতার করেন।

নিঃসন্দেহে এটি শরীয়তপুর জেলা পুলিশের সফলতা। এ সফলতা নজিরবিহীন। কারণ রাতের আঁধারে চুরি হয়ে যাওয়া মালামাল আন্ত:জেলা চোর চক্রের নিকট থেকে উদ্ধার এবং দোষীদের গ্রেফতার সোজা কথা নয়। যেখানে কোন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলনা, কোন আলামত ছিলনা আর চোর চক্র স্থানীয়ও নয়, তাই এ সফল অভিযান অমলিন হয়ে রবে। এ সফলতার পেছনে রয়েছে অদম্য মনোবল, অসীম ধৈর্য্য, শতভাগ পেশাদারিত্ব ও অবর্ণনীয় বুদ্ধিমত্তা। শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করে চোর চক্রের সকল কৌশল পেছনে ফেলে তারা সুনির্দিষ্ট টার্গেটে পৌঁছেছেন। এ অবিস্মরণীয় সফলতার জন্য শরীয়তপুর জেলা পুলিশ সুপার এস এম আশ্রাফুজ্জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম মিজানুর রহমান, ওসি (ডিবি) সাইফুল আলম সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদের সাধুবাদ জানাই। তাদের শ্রম, মেধা, কৌশল ও পেশাদারিত্বের কারণে চুরি হয়ে যাওয়া মোবাইল সেটগুলো উদ্ধার হয়েছে এবং চোর চক্র ধরা পড়েছে। বিষয়টি শরীয়তপুরবাসীর মনে গেঁথে থাকবে। এমন সফল অভিযান অন্য কোথাও হয়েছে বলে আমার জানা নেই। বিশেষ করে চুরি হয়ে যাওয়া মালামাল আন্ত:জেলা চোর চক্রের নিকট থেকে উদ্ধারের ঘটনায় এমন সফলতা সত্যিই প্রশংসনীয়।

আসলে পুলিশের ইতিবাচক কর্ম হাজার হাজার। ইতিবাচক কর্ম সম্পাদন করতে গিয়ে বা দু’একজন নীতি নৈতিকতাহীন সদস্যের জন্য মাঝে মধ্যে যে নেতিবাচক ঘটনা দেখা যায় তা বিবেচনায় না আনাই আমার যুক্তি। আমি বিশ্বাস করি, পুলিশ বাহিনী না থাকলে আমরা বুক টান কের ঘর থেকে বের হতে পারতাম না। পুলিশ বাহিনী কাজ না করলে, সৎ না হলে আমাদের জান-মাল রক্ষা পেত কী-না তা ভেবে দেখা দরকার। দেশে সৎ যোগ্য, দক্ষ, প্রশিক্ষিত পুলিশ বাহিনী আছে বলেই আমরা সম্পূর্ণ নিরাপদে রয়েছি।

আমি দেখেছি যে, আমরা ঘুমিয়ে যাই কিন্তু আমাদের জান-মালের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ ঘুমায় না। আমরা বিশ্রামে যাই, পুলিশ দাড়িয়ে থাকে। আমরা কাজ করি, পুলিশ দাড়িয়ে থাকে। আমরা বিরতি নেই, পুলিশ অবিরাম চলে। তাদের এ নিরলস, নীশি দিন চলার কারণেই ঘরে-ঘরে, মনে-মনে প্রশান্তির সুবাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। ডাকলেই আমরা পুলিশকে পাই। পুলিশের সেবা, পুলিশের সহযোগিতা, তুলনাহীন। আমাদের সকল কাজে, সকলের মাঝে, সকাল সাঁঝে পুলিশ প্রয়োজন নিরাপদে, নিরাপত্তার সাথে, নির্ভয়ে, শঙ্কামুক্ত জীবন ধারনের জন্য। তাই পুলিশকে আপন ভাবতে হবে। পুলিশকে বন্ধু ভাবতে হবে। পুলিশকে সহযোগিতা করতে হবে। পুলিশ-জনতা মিলেই পারে একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। আমরা আসলে কখনই ভেবে দেখিনি যে, পুলিশ না থাকলে আমাদের অবস্থা কী হবে! পুলিশ বিহীন অবস্থায় আমাদের বেঁচে থাকা দূরহ হবে।

আর পুলিশকেও মানবিক হতে হবে। জনগণের করের টাকায় খেয়ে-পড়ে জন কল্যাণের যদি বত্যয় ঘটে, জন কল্যাণ না হয় তাহলে সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্র ব্যর্থ হবে। তাই শতভাগ পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কাজ করতে হবে। সততার সুরক্ষা করতে হবে। দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। লোভ-লালশার উর্ধ্বে উঠতে হবে। আবেগ-অনুরাগ পরিত্যাগ করতে হবে। নিজকে পরিশুদ্ধ রাখতে হবে। জনকল্যাণে কাজ করতে হবে। জনগণ ও সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে সফলতা অর্জন করা যাবে না। জনসম্পৃক্ত থাকতে হবে। সুনাম কুড়াতে হবে। তবেই পুলিশের সফলতার গৌরব চারিদিকে বিকশিত হবে। যেমন হয়েছে পদ্মা পাড়ের জেলা শরীয়তপুরে। শরীয়তপুর জেলা পুলিশের উল্লেখিত সফলতা সারাদেশে অনুকরনীয় অনুস্মরনীয় হয়ে থাকুক।

লেখক: সাংবাদিক শহীদুল ইসলাম পাইলট, লেখক ও কলামিস্ট, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ) কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান আহবায়ক, জেলা প্রতিনিধি দৈনিক সমকাল ও ইউএনবি এবং দৈনিক রুদ্রবার্তা পত্রিকা’র সম্পাদক ও প্রকাশক।